আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার সুকির

আদালত কক্ষে অন্যান্য কৌশুলীদের সাথে মায়ানমায়ের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুকি (Image: Reuters)

মায়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুকি রাষ্ট্রসংঘের আন্তর্জাতিক আদালতে দাঁড়িয়ে তার দেশের বিরুদ্ধে ওঠা রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ অসত্য বলে দাবি করেছেন।

দেশটির সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর মায়ানমার সেনাবাহিনীর কথিত নৃশংসতার প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে চলমান সেই মামলার শুনানিতে মায়ানমারের প্রতিনিধিত্ব করতে দেশটির পক্ষ থেকে সেখানে পাঠানো হয়েছে শান্তিতে নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সুকিকে।

বক্তব্যের শুরুতেই সুকি মায়ানমারের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাটিকে ‘অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ’ হিসেবে অভিহীত করেন। তিনি দাবি করেন, রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল রাখাইন প্রদেশের সমস্যা বহু শতকের পুরনো।

২০১৭ সালে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মায়ানমারের সেনাবাহিনী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সামরিক অভিযান শুরু করলে আনুমানিক কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নিহত হয় এবং প্রায় ৭০০,০০০ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

মায়ানমার শুরু থেকেই তাদের বিরুদ্ধে ওঠা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর রোহিঙ্গাদের সংগঠন ‘আরাকান আর্মির’ কথিত সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষিতে তারা শুধু দুষ্কৃতীকারীদের বিরুদ্ধেই অভিযান চালিয়েছে।

মায়ানমার সরকারের ঐ অবস্থান শুরু থেকেই সমর্থন করে এসেছেন দেশটির স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুকি। সরকার ও সেনাবাহিনীর মত তিনিও গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সুকির এই অবস্থানে বিশ্বজুড়ে তার একসময়ের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। নিজ দেশে সামরিক শাসকদের হাতে দীর্ঘ সময় গৃহবন্দী থাকা এই নেত্রী গণতন্ত্রের জন্য তার ব্যক্তিগত ত্যাগস্বীকারের সুবাদে সারা পৃথিবীতে ব্যাপকভাবে সমাদ্রিত হয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরষ্কারসহ বিশ্বের বহু সন্মানে ভূষিত হন তিনি।

২০১০ সালে গৃহবন্দীত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে নির্বাচনে অংশ নেন সুকি। ২০১২ সালের উপনির্বাচন ও ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল বিজয় পান তিনি। ২০১৬ সালে দেশের নির্বাহী প্রধানের (স্টেট কাউন্সিলর) পদ পেলেও ক্ষমতার রাশ এখনও কার্যত সেনাবাহিনীর হাতেই।

রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের ঘটনায় নিজের সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও নিন্দা জানানোর পরিবর্তে অভিযুক্ত সেনাবাহিনীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় বিশ্বব্যাপী কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েন সুকি। তাকে দেওয়া সন্মানসূচক ডিগ্রি প্রত্যাহার করে নেয় বিশ্বের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়, পুরষ্কার বাতিল করে বিভিন্ন সংগঠন। দাবি ওঠে তাকে দেওয়া নোবেল শান্তি পুরষ্কারও ফিরিয়ে নেওয়ার।

তবে সুকি তার অবস্থান পরিবর্তন করার বদলে এখন উল্টো মায়ানমারের প্রধান আইনজীবি হিসেবে আন্তর্জাতিক আদালতে সেনাবাহিনীর অভিযানকে সমর্থন জানাচ্ছেন।

অভিযোগগুলো কি কি?

২০১৭ সালের শুরুতেও মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ লাখ। মায়ানমার আনুষ্ঠানিকভাবে কখনই রোহিঙ্গাদের নিজে দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তাদের দাবি, রোহিঙ্গারা আসলে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী।

আদিকাল থেকেই রোহিঙ্গাদের ওপর মায়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী্র নির্যাতনের ঘটনা ঘটে এলেও ২০১৭ সালে তা অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে যায়।

একাধিক সেনা চৌকিতে রোহিঙ্গা সমর্থিত সশস্ত্র সংগঠন ‘আরাকান আর্মি’ হামলা চালিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েক সদস্যকে হত্যা করেছে দাবি করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে নামে মায়ানমারের সেনাবাহিনী।

অভিযোগ ওঠে, কথিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানের কথা বললেও, আদতে মত, বয়স, লিঙ্গ নির্বিশেষে পুরো রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপরই নৃশংসতা চালায় সেনাবাহিনী। একের পর এক গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে রোহিঙ্গাদের গুলি করে ও আগুন দিয়ে হত্যা করা করা, নারীদের ঘর থেকে বের করে এনে ধর্ষণ করা হয়, যা থেকে রেহাই পায়নি শিশুরাও, রোহিঙ্গাদের বাড়ি, দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, চাষের জমিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ভয়াবহ সেই তান্ডব থেকে রক্ষা পেতে দলে দলে পালিয়ে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় ৭ লক্ষ রোহিঙ্গা।

মায়ানমারের সরকার ও সেনাবাহিনী প্রথম থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এলেও স্থানীয়দের ধারণ করা ভিডিও ও আলোকচিত্র, স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া বিধ্বস্ত জনপদের ছবি, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও সংগঠনের সংগৃহীত তথ্যপ্রমাণে সামনে আসে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের সুষ্পষ্ট আলামত। রাষ্ট্রসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে সরজমিন তদন্তসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামের করা তদন্তেও রাখাইনে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র উঠে আসে।

এসবের ভিত্তিতেই দ্য হেগে অবস্থিত রাষ্ট্রসংঘের আন্তর্জাতিক আদালতে মায়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া।

কি হতে পারে মামলাটির পরিণতি?

আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর থাকায় গাম্বিয়ার করা মামলা এড়ানোর সুযোগ নেই মায়ানমারের। সেইমত তারা আন্তর্জাতিক আদালতের শুনানিতে অং সান সুকির নেতৃত্বে অংশও নিয়েছে।

তবে মামলার রায়ে মায়ানমারকে দোষী সাব্যস্ত করতে হলে আন্তর্জাতিক আদালতকে এটা নিশ্চিত হতে হবে যে, মায়ানমার ‘ইচ্ছাকৃতভাবে রোহিঙ্গাদের আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল’ করার জন্যই অভিযান চালিয়েছিল।

আবার মামলার রায় মায়ানমারের বিপক্ষে গেলেও তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা নেই আন্তর্জাতিক আদালতের। তারা শুধু তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে কাউকে দোষী বা নির্দোষ হিসেবে ঘোষণা করতে পারে। ফলে মায়ানমার দোষী সাব্যস্ত হলেও সুকি বা সেনাবাহিনীর কোন জেনারেলকে গ্রেফতার করে বিচারের সন্মুখীন করার কোন সুযোগ নেই।

তবে এর কিছু কূটনৈতিক প্রভাব রয়েছে। রায় বিপক্ষে গেলে তার ভিত্তিতে মায়ানমারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক, বাণিজ্য, ভ্রমণসহ বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে বিভিন্ন দেশ ও রাষ্ট্রসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেও চাপ সৃষ্টি হবে দেশটির ওপর। ভবিষ্যৎে রোহিঙ্গা, কাচিনসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর ওপর আবার কোন সহিংস অভিযানের ব্যাপারেও নিরুৎসাহিত হবে দেশটির সরকার।