আরব বিশ্বের দীর্ঘতম শাসক ওমানের সুলতান কাবুসের প্রয়াণ

কাবুস বিন সাঈদ (১৯৪০-২০২০) ওমান শাসন করেছেন একটানা পঞ্চাশ বছর (Image: Reuters)

প্রয়াত হলেন ওমানের সুলতান কাবুস বিন সাঈদ। ৭৯ বছর বয়সী সুলতান কাবুস ছিলেন আরব বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দেশ শাসন করা রাষ্ট্রনেতা।

১৯৭০ সালে ব্রিটেনের সহযোগিতায় রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানে নিজ পিতাকে ক্ষমতাচ্যুত করে সুলতানের পদে বসেন কাবুস। প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ শাসনামলে দেশের খনিজ তেল সম্পদ ব্যবহার করে ওমানকে উন্নত ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন কাবুস। তবে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিরোধী মত দমনের অভিযোগে বিভিন্ন সময় সমালোচিতও হন তিনি।

সুলতান কাবুসের মৃত্যুর পর রাজপরিবারের সিদ্ধান্তে দেশটির প্রাক্তন সংস্কৃতিমন্ত্রী ও কাবুসের নিকটাত্মীয় হাইতাম বিন তারিক আল সাঈদ ওমানের নতুন সুলতান হিসেবে শপথ নেন। প্রয়াত কাবুস নিঃসন্তান ছিলেন এবং উত্তরাধিকারী হিসেবে কাউকে মনোনীতও করে যাননি। সেকারণেই রাজপরিবারের সদস্যরা আলোচনা করে হাইতাম আল সাঈদকে ওমানের নতুন শাসক হিসেবে মনোনীত করেন।

ওমানের শাসন ব্যবস্থায় সুলতানই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তিনি একাধারে প্রধানমন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সদ্যপ্রয়াত সুলতান কাবুস বিন সাঈদ বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। গত মাসে চিকিৎসার জন্য এক সপ্তাহ বেলজিয়ামে অবস্থান করেন তিনি। বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছিল সুলতান কাবুস ক্যান্সারে আক্রান্ত।

সুলতান কাবুসের মৃত্যুর পর তার মরদেহ রাজধানী ওমানের গ্র্যান্ড মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। বিপুল সংখ্যক মানুষ সেখানে তার শেষকৃত্যে অংশ নেন।

সুলতান কাবুস বিন সাঈদ একটানা ৫০ বছর আরবসাগর পাড়ের দেশ ওমান শাসন করেন। প্রায় ৪৮ লক্ষ জনসংখ্যার দেশটির প্রায় ৪৩ শতাংশই অন্যদেশ থেকে আগত।

মাত্র ২৯ বছর বয়সে সুলতান কাবুস তার পিতা তৎকালীন শাসক সাঈদ বিন তৈমুরকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। তৈমুর ছিলেন অতিরক্ষণশীল এক শাসক। তার আমলে এমনকি রেডিও শোনা বা সানগ্লাস পড়াও নিষিদ্ধ ছিল। দেশের কোন নাগরিকেরা বিয়ে করতে পারবে, কারা পড়াশুনা করতে পারবে কিংবা কারা অন্য দেশে যেতে পারবে, সেসবও নির্ধারণ করে দিত তৈমুরের প্রশাসন।

ব্রিটেনের সহায়তা নিয়ে ১৯৭০ সালে তৈমুরকে সিংহাসন থেকে অপসারণ করেন তারই পুত্র কাবুস বিন সাঈদ। এই পটপরিবর্তন ছিল রক্তপাতহীন।

উদারমনস্ক কাবুস ক্ষমতায় বসেই পিতার রক্ষণশীল সব নিয়ম বাতিল করে দেন। তিনি ঘোষণা করেন আধুনিক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের এবং ওমানের খনিজ তেল বিক্রির অর্থ দিয়ে দেশকে সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার। উল্লেখ্য, কাবুসের ক্ষমতারোহনের সময় পুরো ওমানে পাকা সড়ক ছিল ১০ কিলোমিটারের মত আর স্কুল ছিল সব মিলিয়ে মাত্র তিনটি।

বাস্তবিকই পঞ্চাশ বছরের শাসনামলে সুলতান কাবুস ওমানের অর্থনীতির চেহারা বদলে দিয়েছিলেন। খনিজ তেল সম্পদে সমৃদ্ধ ওমানকে দরিদ্র দেশ থেকে আরব বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত করেন কাবুস।

এই মূহুর্তে মাথাপিছু জিডিপির তালিকায় মধ্যপ্রাচ্যের ১৮ দেশের মধ্যে ওমানের অবস্থান পঞ্চম।

ক্যারিশমা, দূরদর্শিতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য সুনাম থাকলেও সুলতান কাবুস বিন সাঈদ ভিন্নমতের ব্যাপারে ছিলেন অসহিষ্ণু।

২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে আরব বসন্তের আবির্ভাব ঘটলে তার ঢেউ এসে লাগে ওমানেও। অন্যান্য দেশের মত তীব্র না হলেও ওমানের বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার লোক রাজপথে নেমে বিক্ষোভ দেখায় বেতন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দূর্নীতি বন্ধের দাবিতে।

ওমানের নিরাপত্তা বাহিনী শুরুর দিকে সংযত থাকলেও পরবর্তীতে টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ব্যবহার করে এমনকি একপর্যায়ে গুলিবর্ষণও করে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনে। সেসময় দুজনের মৃত্যু ও কয়েক ডজন লোকের আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এছাড়া ‘অবৈধ জমায়েত’ ও ‘সুলতানকে অসম্মান করার’ আইনে কয়েকশ লোককে বিচারে মুখোমুখি করা হয়।

আরব বসন্তের সেই প্রতিবাদের জেরে সুলতান কাবুস দীর্ঘদিন ধরে পদে থাকা কয়েকজন মন্ত্রীকে দূর্নীতির দায়ে অপসারণ করেন। এছাড়া তিনি দেশটির উপদেষ্টা পরিষদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন এবং সরকারি খাতে আরও চাকরি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, ঐ সময়ের পর থেকেই ওমান সরকারের সমালোচনা করা স্বাধীন সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনগুলো বন্ধ করা হতে থাকে, সরকারবিরোধী বইপত্র বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং বিরোধী কর্মীদের গ্রেফতারসহ নানাভাবে হয়রানি করা শুরু হয়।

পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে সুলতান কাবুস বিন সাঈদ সবসময়ই নিরপেক্ষতা বজায় রেখে চলেছেন। সেকারণে আরব বিশ্বের সব পক্ষের কাছেই ওমানের নির্ভরযোগ্য গ্রহণযোগ্যতা ছিল। ২০১৩ সালে পরমাণু কর্মসূচী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের গোপন আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছিল ওমান। ঐ আলোচনার ধারাবাহিকতাতেই ২০১৫ সালে ইরানের সাথে পশ্চিমা দেশগুলোর ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।