কে ছিলেন এই বহুল আলোচিত কাশেম সোলাইমানি?

ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাশেম সোলাইমানি (১৯৫৭-২০২০)

বাগদাদ বিমানবন্দরে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানি জেনারেল কাশেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে চর্চা চলছে দাপুটে এই সমরবিদকে নিয়ে।

জেনারেল কাশেম সোলাইমানি ছিলেন রেভল্যুশনারি গার্ড নামে পরিচিত ইরানি সেনাবাহিনীর আন্তর্জাতিক শাখা কুদস ফোর্সের প্রধান। পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের দায়িত্ব ছিল এই কুদস ফোর্সের ওপরই।

কাশেম সোলাইমানির তুখোড় মেধা ও কুশলী নেতৃত্বেই সুন্নিপ্রধান সৌদি আরবের একক কর্তৃত্বে ভাগ বসিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অংশে নিজেদের প্রভাব বলয় সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় শিয়াপ্রধান ইরান।

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও সৌদি আরবের নজরদারি স্বত্তেও সোলাইমানির নেতৃত্বে কুদস ফোর্স একদিকে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের জিহাদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর শক্তি বাড়িয়েছে, অন্যদিকে ইরাক ও সিরিয়ায় ইরানের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে, অপরদিকে সিরিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলা গৃহযুদ্ধে সরকারবিরোধী বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে প্রতিরোধ করে, আবার সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আইএস-কে নির্মূলেও বড় ভূমিকা রেখেছে।

কাশেম সোলাইমানিকে ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘অর্ডার অব জুলফিকারে’ ভূষিত করছেন দেশটির শীর্ষনেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি

মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে কোন একক দেশের এতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারার নজির সাম্প্রতিক অতীতে নেই। আর এর পুরো কৃতিত্বের একক দাবিদার ইরানে জাতীয় বীরের মর্যাদা পাওয়া জেনারেল কাশেম সোলাইমানি।

স্বীকৃতিস্বরূপ গতবছর ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘অর্ডার অব জুলফিকারে’ ভূষিত করা হয় সোলাইমানিকে, দেড়শ বছর আগে প্রবর্তনের পর যে অতি বিরল সম্মানে এর আগে ভূষিত হয়েছেন মাত্র চারজন ইরানি। ১৯৭৯ সালে রাজতন্ত্রের অবসানের সময় এই খেতাবটিও বিলুপ্ত করা হয়েছিল। কিন্তু শুধু কাশেম সোলাইমানিকে সম্মানিত করার জন্য গতবছর খেতাবটিকে পুনঃপ্রবর্তন করেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।

স্বাভাবিকভাবেই নিষ্কন্টক ছিলনা ১৯৯৮ সালে কুদস ফোর্সের প্রধানের দায়িত্ব পাওয়ার পর কাশেম সোলাইমানির দু’দশকের এই সাফল্যযাত্রা। বিভিন্ন সময় সৌদি, ইসরায়েলি ও পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একাধিক হত্যাচেষ্টা শিকার হন সোলাইমানি। আগেরগুলো থেকে বেঁচে গেলেও শুক্রবার শেষরক্ষা হলনা। মার্কিন ড্রোন হামলায় সমাপ্ত হল ইরানের একটি অধ্যায়ের।

কাশেম সোলাইমানির উত্থান

জেনারেল কাশেম সোলাইমানির জন্ম ইরানের কেরমেন প্রদেশের এক দরিদ্র পরিবারে। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই পরিবারকে সাহায্যের জন্য বাইরে কাজে যোগ দিতে হয় সোলাইমানিকে।

১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের সময় তরুণ বয়সে ইরানি সেনাবাহিনীতে নাম লেখান কাশেম সোলাইমানি। ৮০’র দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সীমান্তে বেশকিছু সফল অভিযানের সূত্রে ইরানে বীরের সন্মান পেতে শুরু করেন সোলাইমানি।

১৯৯৮ সালে কাশেম সোলাইমানিকে কুদস ফোর্সের দায়িত্ব দেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি। শুরু থেকেই প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতেন এই জেনারেল। অনেকটা নীরবেই লেবাননে হিজবুল্লাহ, সিরিয়ায় আসাদ সরকার ও ইরাকে সশস্ত্র শিয়া সংগঠনগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করতে শুরু করেন সোলাইমানি। এছাড়া ফিলিস্তিনের ইসলামি জিহাদ, ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীসহ বিভিন্ন সংগঠন ও সরকারের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বাকি অঞ্চলগুলোতেও ইরানের সক্রিয় উপস্থিতি ছড়িয়ে দেন তিনি।

ইরাক ও সিরিয়ায় ভূমিকা

সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ২০০৫ সালে ইরাকে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে কাশেম সোলাইমানি দেশটিতে ইরানের প্রভাব বিস্তারের উদ্যোগ নেন। ইরাকের দুই প্রধানমন্ত্রী ইব্রাহিম আল-জাফারি ও নূরি আল-মালিকির সময়ে শিয়া রাজনৈতিক ও আধাসামরিক সংগঠন ‘বদর অর্গানাইজেশন’ এর মাধ্যমেই মূলত এই প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়।

এর কয়েক বছরের মাথায় ‘ইসলামিক স্টেট’ বা আইএস-র উত্থান শুরু হলে ইরান সমর্থিত শিয়া আধাসামরিক সংগঠন হাশদ আল-শাবি (পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্স নামেও পরিচিত) এর যোদ্ধারা ইরাকি সেনাবাহিনীর সাথে মিলে আইএস-র বিরুদ্ধে সফলভাবে লড়াই করে। একারণেই মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে ইরাক থেকে আইএস-কে নির্মূল করার অনেকখানি কৃতিত্ব জেনারেল কাশেম সোলাইমানিকেও দেওয়া হয়।

অন্যদিকে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন ও তার ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে কাশেম সোলাইমানি ইরাকে থাকা তার অনুগত যোদ্ধাদের সিরিয়ায় প্রবেশ করে আসাদবিরোধী বিদ্রোহীদের প্রতিহত করার নির্দেশ দেন।

একদিকে রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশের কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থন, অন্যদিকে রণক্ষেত্রে বিদ্রোহীদের বিপক্ষে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর সাথে কাশেম সোলাইমানি নিয়ন্ত্রিত গ্রুপসহ বিভিন্ন বাহিনীর প্রতিরোধে শেষপর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে যান বাশার আল-আসাদ।

দীর্ঘদিন নিভৃতে কাজ করে যাওয়ার পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছিলেন কাশেম সোলাইমানি। আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ শিয়া নেতাদের সাথে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেখা যেত তাকে।