পারভেজ মোশাররফকে মৃত্যুদন্ড দিল পাকিস্তানের আদালত

পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফ (Image: Reuters)

পাকিস্তানের একটি আদালত দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফকে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিয়েছে। ক্ষমতাসীন থাকাকালে ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারি সংক্রান্ত একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে এই রায় ঘোষণা করে আদালত।

তবে পারভেজ মুশাররফ এই মূহুর্তে পাকিস্তানেই নেই। চিকিৎসার জন্য বর্তমানে তিনি দুবাইতে অবস্থান করছেন।

৭৬ বছর বয়সী সৈয়দ পারভেজ মুশাররফ ১৯৯৯ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করেন। এর দু’বছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির প্রেসিডেন্টের পদে বসে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করেন তিনি।

যে মামলায় পারভেজ মুশাররফের ফাঁসির আদেশ দিল পাকিস্তানের আদালত, সেটি ২০১৩ সাল থেকে বিচারাধীন ছিল। ক্ষমতা ছাড়ার আগের বছর ২০০৭ সালে সংবিধান স্থগিত করে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন পারপভেজ মুশাররফ। সেই পদক্ষেপকেই ‘উচ্চ পর্যায়ের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে এই রায় দেয় আদালত।

কি আছে মামলাটিতে?

ক্ষমতার একেবারে শেষ পর্যায়ে ২০০৭ সালে প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফ পাকিস্তানের সংবিধান স্থগিত করে দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা জারি করেন। এই পদক্ষেপে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয় পাকিস্তান জুড়ে। এক পর্যায়ে সংসদে থাকা প্রধান দলগুলি প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ করার ব্যাপারে একমত হলে পরের বছর ২০০৮ সালে পদত্যাগ করে ক্ষমতা ছাড়েন পারভেজ মুশাররফ।

যে নওয়াজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন পারভেজ মুশাররফ, ২০১৩ সালে সেই নওয়াজ শরিফই আবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে জরুরি অবস্থা জারি্ ইস্যুতে মুশাররফকে বিচারের মুখোমুখি করার উদ্যোগ নেন। ২০১৪ সালে ‘উচ্চ পর্যায়ের ষড়যন্ত্রের’ দায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয় পারভেজ মুশাররফকে।

মামলা দায়েরের পর পারভেজ মুশাররফ একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে অভিহীত করেন। তিনি দাবি করেন, ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারি করার সিদ্ধান্তটি মন্ত্রীসভায় অনুমোদিত হয়েছিল। তাই এটি অবৈধ হতে পারেনা।

কিন্তু আদালত সেই যুক্তি খারিজ করে দিয়ে মুশাররফকে ষড়যন্ত্রের দায়ে অভিযুক্ত করে।

পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, উচ্চ পর্যায়ের ষড়যন্ত্র প্রমাণিত হলে অভিযুক্তের সর্বোচ্চ মৃত্যুদন্ডও হতে পারে। পারভেজ মুশা্ররফের বেলাতেও সেই রায়ই দিল আদালত। জানা গেছে, এই মামলার তিন সদস্যের বেঞ্চে দু’জনই মুশাররফের মৃত্যুদন্ডের পক্ষে সম্মত হন।

দুবাইয়ের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পারভেজ মুশাররফ (Image: All Pakistan Muslim League (APML) Handout)

তবে এই রায় আদৌ বাস্তবায়ন করা যাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ২০১৬ সালে চিকিৎসার জন্য দেশত্যাগের অনুমতি দেওয়া হলে পারভেজ মুশাররফ দুবাইয়ে পাড়ি জমান।

দুবাইতে চিকিৎসাধীন পারভেজ মুশাররফ এ মাসের শুরুর দিকে হাসপাতালের বিছানা থেকে ধারণ করা এক ভিডিও বার্তায় এই মামলাকে ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছিলেন।

অসুস্থ মুশাররফকে সেখান থেকে ফিরিয়ে এনে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার কোন আগ্রহ সরকার দেখাবেনা বলেই মনে করা হচ্ছে। তাছাড়া এই রায়ের ব্যাপারে পাকিস্তানের সরকার ও সেনাবাহিনী এরই মধ্যে অসন্তোষ জানাতে শুরু করেছে। উল্লেখ্য, পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সেনাবাহিনীর সহায়তা নিয়েই ক্ষমতাসীন হয়েছেন বলে অভিযোগ করে আসছে দেশটির বিরোধীদলগুলো।

এক নজরে পারভেজ মুশাররফ

অবিভক্ত ভারতের দিল্লিতে ১৯৪৩ সালে জন্ম নেওয়া পারভেজ মুশাররফ পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ১৯৬১ সালে।

১৯৯৮ সালে তাকে সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ। পরের বছর কার্গিলে ভারতের সাথে সামরিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে মতানৈক্য সৃষ্টি হয় প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ ও সেনাপ্রধান মুশাররফের মধ্যে। তার জেরে ১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন পারভেজ মুশাররফ।

মুশাররফের প্রায় এক দশকের শাসনামলে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে ছিল সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীকে সহায়তা, লাল মসজিদে অভিযান, আত্মঘাতী হামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভূট্টোর নিহত হওয়া, নিজের ওপর একাধিকবার প্রাণঘাতী হামলার চেষ্টা, বিভিন্ন ইস্যুতে উচ্চ আদালতের সাথে সংঘাত, আইনজীবিদের দেশব্যাপী নজিরবিহীন আন্দোলন প্রভৃতি।

সামরিক পোশাক ছেড়ে বেসামরিক পরিচয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও সংসদে শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব ছিলনা মুশাররফের দলের। অন্যদিকে চিরবৈরী নওয়াজ শরিফের মুসলিম লীগ ও বেনজির ভূট্টোর পিপলস পার্টি্র মধ্যে মুশাররফ বিরোধী ঐক্য গড়ে উঠলে চাপে পড়েন পারভেজ মুশাররফ। একপর্যায়ে তারা প্রেসিডেন্টকে সংসদে অভিশংসিত করার সিদ্ধান্ত নিলে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন মুশাররফ।

প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে যাবার পর দেশও ছাড়েন পারভেজ মুশাররফ। কয়েক বছর পর ২০১৩ সালে নির্বাচনে অংশ নিতে পাকিস্তানে ফেরেন তিনি। সেসময় তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের করা হয়, যার মধ্যে বেনজির ভূট্টোকে হত্যার ঘটনার সংশ্লিষ্টতার মামলাও রয়েছে।

শারীরিক অসুস্থতার কারণে পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকবার হাসপাতালে ভর্তি হন মুশাররফ। তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি চাইলে আদালত এক সময় তা মঞ্জুর করেন। সেইমত ২০১৬ সালে পারভেজ মুশাররফ দেশ ছাড়েন। তারপর থেকে তিনি দুবাইতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।