পার্লামেন্ট থেকে বিক্ষোভকারীদের সরাল হংকং পুলিশ

বিক্ষোভকারীদের সরানোর পর ক্ষতিগ্রস্থ পার্লামেন্টের সামনে পুলিশি পাহারা (image: Reuters/Jorge Silva)

হংকংয়ের পার্লামেন্ট ভবনে হঠাৎ ঢুকে পড়া বিক্ষোভকারীদের অবশেষে সরিয়ে দিয়েছে দেশটির পুলিশ। টিয়ার গ্যাস আর ধস্তাধস্তির মধ্যেই নিরাপত্তাবাহিনীর পুনঃনিয়ন্ত্রণে চলে আসে কয়েক ঘন্টার জন্য বেদখল হয়ে যাওয়া হংকংয়ের সংসদ।

ব্রিটেনের কাছ থেকে হংকংয়ের স্বার্বভৌমত্ব চীনের কাছে হস্তান্তরের বার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানী হংকং সিটিতে গতকাল এক জমায়েতের আয়োজন করা হয়। অবশ্য বিতর্কিত বহিঃসমর্পণ বিল বাতিল, সরকার প্রধানের পদত্যাগ, পুলিশি হামলার তদন্তসহ বিভিন্ন দাবিতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই প্রতিদিন হংকংয়ের রাজপথে জড়ো হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ।

ঘটনাক্রম ..

১৯৯৭ সালের ১ জুলাই নিজেদের দেড় শতাব্দীর শাসনের অবসান ঘটিয়ে হংকংকে আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের কাছে ফিরিয়ে দেয় ব্রিটেন। দিনটির ২২তম বার্ষিকী উদযাপনে চলমান আন্দোলনের আয়োজকরা হংকংয়ের রাজপথে এক র‍্যালির আয়োজন করে। বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকেও একাধিক কর্মসূচী পালিত হয় দিনটি স্মরণে।

আন্দোলনকারীদের মিছিলের কর্মসূচী সকাল থেকেই ছিল শান্তিপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত। দুপুরের দিকে মিছিলের একটি অংশ হঠাৎ আলাদা হয়ে পার্লামেন্ট ভবনের দিকে এগোনো শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে পৌঁছে প্রথমে তারা ভবনের প্রবেশদ্বার এবং আশপাশ অবরুদ্ধ করে ফেলে। কিছুক্ষণের মধ্যে আরও কয়েকশ বিক্ষোভকারী তাদের সাথে যোগ দিয়ে পার্লামেন্ট ভবনে ঢুকে পড়ে ভাঙচুর শুরু করে। তারা পার্লামেন্টের মূল অধিবেশন কক্ষে অবস্থান নিয়ে সেখানেও তান্ডব চালায়।

অবরোধকারীরা মূল অধিবেশন কক্ষে স্পীকারের চেয়ারের পেছনে রাষ্ট্রীয় সিলে কালি কাগিয়ে দেয়। দেয়াল জুড়ে লিখে দেয় নিজেদের নানান স্লোগান। টাঙিয়ে দেয়া হয় ব্রিটেনের পতাকা, একসময় যে দেশের অধীনে ছিল হংকং। সংসদ সদস্যদের ডেস্কগুলো তছনছ করা হয়। চলমান আন্দোলনে নিহত কয়েকজনের বড় আকারের ছবি রেখে দেওয়া হয় স্পীকারের টেবিলের সামনে।

এসব চলার সময় বিরোধীদলীয় কয়েকজন সাংসদ, যারাও চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সমর্থক, তাদেরকে ভাঙচুরকারীদের থামানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়। তারা বিক্ষোভকারীদের এই বলে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, তারা যা করছেন তাতে সরকার তাদের ওপর বলপ্রয়োগের অজুহাত পেয়ে যাবে।

কিন্তু সহিংস বিক্ষোভকারীরা তাদের কথা আমলেই নিচ্ছিলেন না বলে জানালেন সেই সাংসদদের একজন ৬৬ বছর বয়সী লিউং ওয়াইউ-চাং। উলটো তারা বলতে থাকেন, তারা যেকোন পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুত।

পার্লামেন্ট ভবনে ঢুকে পড়ার আগে উপস্থিত পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলতে থাকে যে তারা বলপ্রয়োগ করতে এবং তাদের গ্রেফতার করতে বাধ্য হবে। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা তাতে কান না দিয়ে একপর্যায়ে ভেতরের একটি ফটক ভেঙে ফেললে নিরাপত্তা বাহিনীই পিছু হটে যায়। বিক্ষোভকারীদের সাথে সংঘাতে জড়ানোর পরিবর্তে তারাই বরং পার্লামেন্ট ভবন ছেড়ে চলে যায়। পুলিশ বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই আরও বিপুল সংখ্যক বিক্ষোভকারী পার্লামেন্টে প্রবেশ করে এবং অধিবেশন কক্ষসহ ভবনের বিভিন্ন অংশে অবস্থান নেয়।

এভাবে কয়েকঘন্টা চলার পর মধ্যরাতে পূর্ণপ্রস্তুতি নিয়ে আবার সেখানে ফিরে আসে নিরাপত্তা বাহিনী। মাথায় হলুদ হেলমেট আর হাতে ছাতা ধরা বিক্ষোভকারীদের ওপর মৃদু লাঠিচার্জ শুরু করলে একে একে সংসদ প্রাঙ্গণ ছেড়ে চলে যায় তারা। কয়েকজন বিক্ষোভকারী জোর করে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করলেও তাদের সহকর্মীরাই তাদেরকে বাইরে নিয়ে আসেন।

ঘন্টাখানেকের মধ্যে পার্লামেন্টের ভেতর শুধু নয়, বাইরের রাস্তাও খালি করে ফেলতে সক্ষম হয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। এরপর কেবল পুলিশ ও গণমাধ্যম কর্মীরাই সেখানে ছিলেন। তবে পুরো অভিযানে এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করার কোন খবর পাওয়া যায়নি।

হংকংয়ে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভ কর্মসূচীতে এখন পর্যন্ত বিনা প্ররোচনায় সহিংসতার কোন ঘটনা ঘটেনি। পুলিশের পক্ষ থেকে হামলা বা আটকের চেষ্টা হলে কেবল তখনই সংঘর্ষে জড়িয়েছে বিক্ষোভকারীরা।

সেদিক থেকে গতকালের ঘটনা চলমান বিক্ষোভ আয়োজনকারীদের জন্য চরম অস্বস্তিকর। একে তো পার্লামেন্ট ভবনের দিকে যাওয়ার কোন পরিকল্পনাই তাদের ছিলনা, তার ওপর দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এই স্থাপনার ভেতরে ঢুকে বিনা উস্কানিতে তান্ডব চালানোকে হংকংয়ের সাধারণ মানুষ, যারা এতদিন আন্দোলনকে সমর্থন করেছে এবং অংশগ্রহণও করেছে, তারা কতটা ভাল চোখে দেখবে তা নিয়ে চিন্তিত আয়োজকরা।

বিক্ষোভকারীদের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশের ঘটানো অনাকাঙ্খিত এই কান্ডের জেরে আন্দোলনে যেন ভাটা না পড়ে সেটা নিশ্চিত করাই এখন নেতাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

স্বাভাবিকভাবেই গণবিক্ষোভে কয়েক সপ্তাহ ধরে চাপের মুখের থাকা হংকংয়ের প্রধান প্রশাসক ক্যারি ল্যামের জন্য এই ঘটনা একটি অপ্রত্যাশিত উপহার। তাই এর পুরো ফায়দা নিতে পার্লামেন্ট ভবনে তান্ডবের পরপরই সময় নষ্ট না করে সংবাদ সন্মেলন ডাকেন চীনপন্থী হিসেবে পরিচিত এই নেত্রী।

তিনি সংসদে হওয়া ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে ক্যারি ল্যাম হুশিয়ারি ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, যেকোন রকমের অবৈধ কর্মকান্ডকে সরকার শক্তভাবে মোকাবেলা করবে।

ক্যারি ল্যাম তার নিজের অবস্থান শক্ত করার জন্য এমন কড়া কড়া কথা বললেও হংকংয়ের সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং বাইরের দেশগুলিও পার্লামেন্টে তান্ডবের ঘটনায় দৃশ্যত ক্ষুব্ধ এবং বিরক্ত। তাদের মতে, আন্দোলনে স্বতঃস্ফুর্তভাবে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে সরকার যখন এমনিতেই চাপে ছিল, তখন আগ বাড়িয়ে এরকম হঠকারী কান্ড ঘটিয়ে সরকারকেই ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হল।

এখন দেখার বিষয়, হংকংয়ের সংসদে নজিরবিহীন হামলার ঘটনা চীনবিরোধী আন্দোলনের নেতারা শেষ পর্যন্ত সামাল দিতে পারেন, নাকি এটাকে পুঁজি করে আন্দোলনের রাশ টেনে ধরতে সক্ষম হয় চীনপন্থী ক্যারি ল্যামের সরকার।

সোমবারের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্থ হংকং পার্লামেন্টের কিছু ছবি :