বিচ্ছিন্নতাবাদী কাতালানদের সমর্থনে টিকে যাচ্ছে স্পেনের সরকার

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সাঞ্চেজ (Image: Reuters)

স্পেন থেকে বেরিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন দেখা কাতালানদের সবচেয়ে বড় দল ‘এসকুয়েরা রিপাবলিকানা দে কাতালোনিয়া’ (ইআরসি)-র পরোক্ষ সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে যাচ্ছেন দেশটির অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সাঞ্চেজ।

আগামী সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী সাঞ্চেজের ক্ষমতায় থাকার ব্যাপারে আস্থাভোট অনুষ্ঠিত হবে স্পেনের সংসদে। সেখানে ইআরসি সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দেবে বলে এতদিন ঠিক থাকলেও প্রধানমন্ত্রী সাঞ্চেজ দলটিকে সে অবস্থান থেকে সরে আসতে রাজি করাতে পেরেছেন।

অবশ্য ইআরসি সংসদে সাঞ্চেজের সরকারের পক্ষেও ভোট দেবেনা, তারা ভোটদান থেকে বিরত থাকবে মাত্র। প্রধানমন্ত্রী সাঞ্চেজের জন্য সেটিই যথেষ্ঠ। কারণ ইআরসি বাদে বাকি সাংসদদের বেশিরভাগই আস্থাভোটে সরকারের পক্ষে থাকছে।

ইআরসি-র এই ‘উপকারের’ প্রতিদানে প্রধানমন্ত্রী সাঞ্চেজ তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কাতালোনিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা্য় বসার।

ইউরোপের দক্ষিণে অবস্থিত রাষ্ট্র স্পেনের রাজনীতি গত এক বছর ধরেই অস্থির সময় পার করছে। গত এক বছরে দেশটিতে দু’টি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

নভেম্বরে হয়ে যাওয়া সর্বশেষ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী সাঞ্চেজের দল সোশ্যালিস্ট পার্টি এককভাবে সবচেয়ে বেশি আসনে জিতলেও সরকার গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় ১৭৬ আসন পেতে ব্যর্থ হয়।

দলটি পরবর্তীতে কট্টর বামপন্থী সংগঠন ‘পোডেমস’ এর সাথে সরকার গড়ার ব্যাপারে সমঝোতায় এলেও প্রয়োজনীয় সংখ্যা থেকে তখনও কয়েকজন সাংসদ কম ছিল তাদের। সেই অবস্থায় ১৩ সাংসদের দল কাতালানের ইআরসি ও আরও কয়েকটি দলের সমর্থন আদায়ের উদ্যোগ নেয় সোশ্যালিস্ট পার্টি।

এই অবস্থায় নির্বাচনের পর থেকে অন্তবর্তী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসা পেদ্রো সাঞ্চেজের সরকারকে আগামী সপ্তাহে সংসদে দু’টি আস্থাভোটের মুখোমুখি হতে হবে। প্রথম ভোটে স্থায়ী সরকার গড়ার জন্য ৩৫০ আসনের সংসদে কমপক্ষে ১৭৬ জন্ সাংসদের সমর্থন পেতে হবে তাকে। আর তাতে ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় ভোটে অন্ততপক্ষে অন্তর্বর্তী সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য বিপক্ষের চেয়ে পক্ষে বেশি সাংসদের সমর্থন দেখাতে হবে।

প্রথম ভোটে পেদ্রো সাঞ্চেজ নিশ্চিতভাবেই পরাজিত হতে চলেছেন, ফলে স্থায়ী সরকার তিনি গড়তে পারবেন না। কিন্তু যতদিন না তিনি বা অন্য কেউও তা করতে পারছেন, ততদিন পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ চালিয়ে যাওয়ার ম্যান্ডেট তিনি দ্বিতীয় ভোটে পেয়ে যাবেন, যেহেতু কাতালানের দল ইআরসি-কে তিনি সরকারের বিপক্ষে ভোট না দেওয়ার জন্য রাজি করিয়ে ফেলেছেন।

বিনিময়ে কাতালোনিয়ার প্রাপ্তি?

সংসদে সরকারের বিপক্ষে ভোট না দেওয়ার প্রতিদানে ইআরসি-কে ক্ষমতাসীন সোশ্যালিস্ট পার্টি কথা দিয়েছে, কাতালোনিয়ার প্রাদেশিক সরকারের সাথে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার প্রদেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করবে।

স্পেন সরকার ও কাতালান সরকারের মধ্যকার সেই আলোচনার ফলাফল নিয়ে এরপর নাগরিক ভোট অনুষ্ঠিত হবে কাতালান প্রদেশে।

কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার চেষ্টা

স্পেনের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত দেশটির সবচেয়ে শিল্পোন্নত ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ প্রদেশ কাতালোনিয়া। স্প্যানিশদের থেকে স্বতন্ত্র্য পরিচয়, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থাকায় কাতালানরা কখনই নিজেদেরকে স্পেনের অংশ হিসেবে মনে করেনা। এছাড়া আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রদেশটির আয়ের একটা বড় অংশ স্পেনের কেন্দ্রীয় কোষাগারে চলে গেলেও উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রদেশটিকে বঞ্চনা করা হয় বলে দাবি কাতালানদের।

এসব কারণেই স্পেন থেকে বেরিয়ে স্বাধীন কাতালান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে প্রদেশটি। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে স্বাধীনতার প্রশ্নে কাতালোনিয়ায় গনভোট হয়। তাতে ৯২ শতাংশ নাগরিক কাতালান রাষ্ট্রের পক্ষে ভোট দিলে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয় প্রদেশটির সংসদ।

একে অসাংবিধানিক হিসেবে বর্ণনা করে কঠোর অবস্থানে যায় স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার। কয়েক মাস আগে স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট কাতালোনিয়ার স্বাধীনতাপন্থী নয়জন নেতাকে কারাদন্ড দিলে প্রদেশটিতে আবারও উত্তজনা ছড়িয়ে পড়ে। প্রাদেশিক রাজধানী বার্সেলোনাসহ কাতালোনিয়ার বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের বিক্ষোভ দেখায় কাতালানরা।

নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচন

এসবের মধ্যেই গত নভেম্বরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় স্পেনে। তাতেও মূল ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় কাতালান পরিস্থিতি। নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে ডানপন্থী ভক্স ও পিপি এবং মধ্য-ডানপন্থী সিউডাডানোস কাতালোনিয়ার স্বাধীনতাচেষ্টার কট্টর বিরোধী। বিপরীতে বামপন্থী সোশ্যালিস্ট পার্টি ও পোডেমস এর মত দলগুলোর অবস্থান কিছুটা নরম।

নির্বাচনে কোন দলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সোশ্যালিস্ট পার্টি অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

নির্বাচনে কাতালান প্রদেশে সবচেয়ে বেশি আসন পায় সবচেয়ে পুরনো স্বাধীনতাপন্থী দল ‘এসকুয়েরা রিপাবলিকানা দে কাতালোনিয়া’ (ইআরসি)। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ২০১৭ সালের গনভোটের সময় ক্ষমতায় থাকা ‘জুন্টস পাস কাতালোনিয়া’।