মার্কিন হামলায় নিহত ইরানের ‘সেরা জেনারেল’ কাশেম সোলাইমানি

ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাশেম সোলাইমানি (১৯৫৭-২০২০)

ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও চৌকষ সামরিক কমান্ডার হিসেবে পরিচিত জেনারেল কাশেম সোলাইমানি মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন।

প্রতিবেশী ইরাকের বাগদাদ বিমানবন্দরের বাইরে সোলাইমানির গাড়িতে ড্রোন থেকে চালানো রকেট হামলায় মারা যান তিনি। মার্কিন বাহিনীর এই হামলায় সোলাইমানির সাথে থাকা আরও বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন।

ইরানের অভিজাত ‘কুদস ফোর্স’ এর প্রধান হিসেবে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে দেশটির সামরিক প্রভাব বিস্তারের মূল কারিগর ছিলেন ৬২ বছর বয়সী এই সমরবিদ।

জেনারেল সোলাইমানির নেতৃত্বে কুদস ফোর্স একদিকে লেবাননে হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনে জিহাদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর শক্তি বাড়িয়েছে, অন্যদিকে ইরাক ও সিরিয়ায় ইরানের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করতে পেরেছে, অপরদিকে সিরিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলা গৃহযুদ্ধে সরকারবিরোধী বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে প্রতিরোধ করেছে, আবার সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আইএস-কে নির্মূলেও বড় ভূমিকা নিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে কোন একক দেশের এতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারার নজির সাম্প্রতিক অতীতে নেই। আর কুদস ফোর্সের প্রধান হিসেবে এর পুরো কৃতিত্ব দেওয়া হয় কাশেম সোলাইমানিকেই।

তাই জেনারেল সোলাইমানির মৃত্যুতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এই হত্যাকান্ডে জড়িতদের জন্য ‘প্রচন্ড প্রতিশোধ’ অপেক্ষা করছে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি সোলাইমানির মৃত্যুতে ইরানে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন।

আয়াতুল্লাহ খামেনির পর জেনারেল কাশেম সোলাইমানিকেই ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে মনে করা হত, এমনকি দেশটির প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির চেয়েও। রেভল্যুশনারি গার্ড নামে পরিচিত দেশটির সেনাবাহিনীর আন্তর্জাতিক শাখা কুদস ফোর্সের প্রধান হিসেবে ১৯৯৮ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করছিলেন সোলাইমানি। তিনি ও কুদস ফোর্স তাদের কাজের জন্য সরাসরি আয়াতুল্লাহ খামেনির কাছেই জবাবদিহি করতেন; প্রেসিডেন্ট, সরকার বা সংসদের কাছে নয়। ইরানে ‘হাজি কাশেম’ নামে পরিচিত সোলাইমানিকে জাতীয় বীরের মর্যাদা দেওয়া হত।

তবে যুক্তরাষ্ট্র জেনারেল সোলাইমানি ও কুদস ফোর্সকে চিহ্নিত করে আসছিল সন্ত্রাসী হিসবে। দেশটির দাবি, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সন্ত্রাসী হামলায় বহু মার্কিন নাগরিকের হতাহতের পেছনে কুদস ফোর্সের হাত রয়েছে।

বিমান হামলায় কাশেম সোলাইমানির নিহত হওয়ার খবর প্রকাশের পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার একটি ছবি টুইট করেন। মার্কিন সামরিক সদর দপ্তর পেন্টাগন থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, কাশেম সোলাইমানি ইরাক ও মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মার্কিন কূটনীতিক ও সামরিক ব্যক্তিদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছিলেন। ইরানের করা এসব পরিকল্পনা অকার্যকর করতেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে সোলাইমানির বিরুদ্ধে এই অভিযান চালানো হয়েছে বলে দাবি তাদের।

হামলার বর্ণনা

মার্কিন ড্রোন হামলার কিছুক্ষণ আগে কাশেম সোলাইমানিকে বহনকারী একটি বিমান বাগদাদ বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ধারণা করা হচ্ছে, সোলাইমানিকে নিয়ে বিমানটি লেবানন অথবা সিরিয়া থেকে ফিরেছিল।

বিমানবন্দর থেকে একাধিক গাড়ির বহর নিয়ে বের হন কাশেম সোলাইমানি। বিমানবন্দরের ঠিক পাশের রাস্তাটি দিয়ে যাওয়ার সময়ই ওপরে থাকা মার্কিন বাহিনীর ড্রোন থেকে পরপর কয়েকটি রকেট ছোঁড়া হয় গাড়িবহরকে লক্ষ্য করে।

কাশেম সোলাইমানির গাড়িতে রকেট আঘাত করলে প্রচন্ড বিস্ফোরণে গাড়িটি দুমড়ে মুচড়ে যায় এবং আগুন ধরে যায়। জেনারেল কাশেম সোলাইমানিসহ অন্তত সাতজন সেখানেই মারা যান।

নিহতদের পরিচয়

ড্রোন হামলায় নিহত সাতজনের মধ্যে জেনারেল কাশেম সোলাইমানি ছাড়াও ইরাকের মিলিশিয়া নেতা মাহদি আল-মুহানদিও রয়েছেন। ইরান সমর্থিত কাতাইব হেজবুল্লাহ গ্রুপের এই কমান্ডারকে এক সপ্তাহ আগে উত্তর ইরাকে হামলা চালিয়ে এক বেসামরিক মার্কিন ঠিকাদারকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত করে আসছিল ওয়াশিংটন।

এছাড়া কাশেম সোলাইমানির জামাতা ও লেবাননের হিজবুল্লাহ গ্রুপের এক নেতাও ড্রোন হামলায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন।

ইরানের প্রতিক্রিয়া

মার্কিন ড্রোন হামলায় জেনারেল কাশেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এক বিবৃতিতে বলেছেন, “অপরাধী আমেরিকার ঘটানো ঘৃণ্য এই অপরাধের প্রতিশোধ ইরান এবং অন্যান্য ‘স্বাধীন’ দেশগুলো নেবে”।

ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ মার্কিন হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস’ হিসেবে অভিহীত করে হুমকি দিয়েছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের বেপরোয়া অ্যাডভেঞ্চারের সকল পরিণতির দায় তাদেরকেই নিতে হবে”।

এদিকে কাশেম সোলাইমানির মৃত্যুর পর জেনারেল ইসমাইল কানিকে কুদস ফোর্সের নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি।

অন্যদের প্রতিক্রিয়া

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদুল মাহদি এক বিবৃতিতে জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এতে ঐ অঞ্চলে চলমান উত্তেজনা আরও তীব্র হয়ে উঠবে।

রাশিয়ার পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে ‘খুন’ হিসেবে অভিহীত করে একে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কান্ডজ্ঞানহীন পদক্ষেপ’ বলে মন্তব্য করা হয়েছে।

লেবাননের ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ গ্রুপ সোলাইমানির মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার ডাক দিয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ড্রোন হামলাকে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকার রয়েছে নিজেকে রক্ষা করার।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলে কাশেম সোলাইমানিকে হত্যার ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। প্রেসিডেন্টের দল রিপাবলিকান পার্টি একে স্বাগত জানালেও বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টি এই ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি পাবে উল্লেখ করে এর নিন্দা জানিয়েছে।