আমাজনে ভয়বাহ আগুন : ক্ষতির শিকার বিস্তীর্ণ এলাকা

আমাজনে ভয়বাহ আগুন : ক্ষতির শিকার বিস্তীর্ণ এলাকা
ভয়াবহ দাবানলের শিকার 'পৃথিবীর ফুসফুস' নামে পরিচিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ বন আমাজন (Image: AFP)
পৃথিবীর ফুসফুস বলে পরিচিত উত্তর আমেরিকার আমাজন জঙ্গল গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ভয়াবহ দাবানলে পুড়ছে।
ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলের রোরাইমা, অ্যাকরে, রোনডোনিয়া ও আমাজোনাস প্রদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে এই আগুনে।
ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে, স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ব্রাজিলে ২০১৯ সালে রেকর্ড পরিমান অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে।
‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন স্পেস রিসার্চ’ (ইনপে) জানাচ্ছে, ২০১৮ সালের একই সময়ের তুলনায় এবছর অগ্নিকান্ডের মাত্রা ৮৫ শতাংশ বেশি।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সালের প্রথম আট মাসে ব্রাজিলে বনে আগুন লাগার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে ৭৫,০০০ টি। গত বছর প্রথম আট মাসে যে সংখ্যাটি ছিল ৪০,০০০। ২০১৩ সালের পর এবছরই সবচেয়ে বেশি এধরনের অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে।
গরমের মৌসুমে আমাজন জঙ্গলে আগুন লাগা স্বাভাবিক একটি ঘটনা। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই মৌসুমে বজ্রপাতের মত প্রাকৃতিক কারণে যেমন অগ্নিকান্ড হতে দেখা যায়, তেমনি ক্ষেত পরিষ্কার করার জন্য কৃষকদের জমিতে আগুন দেওয়া থেকেও অনেক সময় দাবানল ছড়িয়ে পড়ে।
ব্রাজিলের বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করছে, দেশটির বর্তমান শিল্পায়নপন্থী প্রেসিডেন্ট জায়ার বোলসোনারোর পরিবেশবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির কারণেও ব্রাজিলের বিভিন্ন এলাকায় আগুন লাগিয়ে জমি পরিষ্কারের প্রবণতা বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট বোলসোনারো পাল্টা অভিযোগ করেছেন, তার সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য বিরোধীরাই আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটাচ্ছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ উত্তর ব্রাজিল
আমাজনের অগ্নিকান্ডে ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। রোরাইমা, অ্যাকরে, রোনডোনিয়া ও আমাজোনা – এই প্রদেশগুলোতে গত চার বছরের গড়ের তুলনায়ও এবার বেশি মাত্রায় আগুন লাগার তথ্য পাওয়া গেছে। রোরাইমায় ১৪১%, অ্যাকরেতে ১৩৮%, রোনডোনিয়ায় ১১৫% এবং আমাজোনাসে ৮১% বৃদ্ধি পেয়েছে আগুন লাগার হার।
এদের মধ্যে ব্রাজিলের বৃহত্তম প্রদেশ আমাজোনাসে জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়েছে।
ছড়াচ্ছে ধোঁয়া ও কার্বন
আমাজনে লাগা আগুনের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে আশেপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায়। ধোঁয়ায় কালো হয়ে গেছে ৩২০০ কিলোমিটার দূরের সাও পাওলোর আকাশও।
ভয়াবহ এই দাবানল থেকে এখন পর্যন্ত ২২৮ মেগাটন কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়েছে, যা ২০১০ সালের পর ওই অঞ্চলে সর্বোচ্চ। এছাড়াও দাবানল থেকে কার্বন-মনো-অক্সাইডও নির্গত হচ্ছে বিপদজনক মাত্রায়। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, এই কার্বন-মনো-অক্সাইড দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
আমাজন অববাহিকায় প্রায় ৩ মিলিয়ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীকূলের আবাস। এই বন প্রায় ১ মিলিয়ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীরও আশ্রয়স্থল। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এই অরণ্য বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন টন কার্বন শুষে নেয় বিশাল এই বনটি।
কিন্তু যখনই কোন গাছ কাটা হয় বা পোড়ানো হয়, তখন এই শুষে নেওয়া কার্বন গাছের শরীর থেকে বেরিয়ে আবার ফিরে যায় প্রকৃতিতে। এভাবে গোটা বনেরই কার্বন শোষণের সার্বিক ক্ষমতা হ্রাস যায়।
 
আমাজনে নিয়মিত আগুনে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলোও
আমাজন অরণ্যে মাঝেমধ্যেই ঘটা এসব অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ব্রাজিলের বিস্তীর্ণ এলাকা ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এর আশেপাশের দেশগুলোও। একাধিক দেশের সমন্বয়ে গঠিত আমাজন অববাহিকার মোট আয়তন ৭.৪ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে আমাজনের ব্রাজিল অংশে যেখানে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭৫,০০০ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে ভেনেজুয়েলায় ঘটেছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৬,০০০ টি। এর পরের অবস্থানে আছে বলিভিয়া, সেখানে এই সময়ের মধ্যে আগুন লাগার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে ১৭,০০০ টি।
আমাজনে ছড়িয়ে পড়া এবছরের দাবানলেও ব্রাজিলের পাশাপাশি এর প্রতিবেশী দেশগুলোও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে একাধিক দেশ জলবাহী বিশেষ বিমান ভাড়া করেছে। অতিরিক্ত জরুরি সেবাকর্মী পাঠানো হয়েছে উপদ্রুত এলাকায়। আগুনে আশ্রয়হীন হওয়া পশুপাখিদের জন্য অভয়াশ্রম নির্মাণ করা হচ্ছে।