হংকংয়ের স্থানীয় নির্বাচনে বিপুল বিজয় পেল সরকার বিরোধীরা

ভোট দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় হংকংয়ের বাসিন্দারা (Image: Reuters, Marko Djurica)

হংকংয়ের জেলা কাউন্সিল নির্বাচনে অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীরা।

স্থানীয় গণমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচন হওয়া ১৮টি কাউন্সিলের মধ্যে ১৭টিতেই জয়ী হয়েছে তারা।

হংকংয়ের সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই ভোটের দিন অশান্তি, এমনকি শেষ মূহুর্তে নির্বাচন স্থগিত করে দেওয়ারও আশঙ্কা করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয় পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া।

হংকংয়ের চীনপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে গত কয়েকমাস ধরে চলা লাগাতার আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত হওয়া এই নির্বাচনকে দেখা হচ্ছিল সরকারের জনপ্রিয়তার পরীক্ষা হিসেবে।

হংকংয়ের সরকার ও বেইজিং আশা করেছিল দৃশ্যমান বিক্ষোভের বিপরীতে নাগরিকরা এই নির্বাচনে ‘নীরবে’ তাদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে দেবেন। কিন্তু বাস্তবে তেমনটা হলনা। এমনকি সরকারি দলের কয়েকজন শক্তিশালী প্রার্থীও ধরাশায়ী হয়েছেন নির্বাচনে।

ভোটদানের পর কেন্দ্র থেকে বের হচ্ছেন হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যাম। দিন শেষে নির্বাচনের ফলাফল চীনপন্থী এই নেত্রীর জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে (Image: Reuters)

কেন এই নির্বাচন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

হংকংয়ের জেলা কাউন্সিলগুলো রাজনৈতিকভাবে অতটা শক্তিশালী নয়। আবার এগুলোর ক্ষমতাও স্থানীয় সমস্যা সমাধান, যেমন বাসের রুট নির্ধারণ বা এলাকার ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। একারণেই জেলা কাউন্সিলের নির্বাচন নিয়ে দেশটিতে সচরাচর খুব একটা হইচই হয়না।

তবে এবারের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সরকারের বিরুদ্ধে স্মরণকালের নজিরবিহীন গণবিক্ষোভের পর এটাই ছিল হংকংয়ের প্রথম বড় নির্বাচন। স্বাভাবিকভাবেই ভোট দেওয়ার সময় জনগণ স্থানীয় ইস্যুর পাশাপাশি জাতীয় এই আন্দোলন ও সরকারের গ্রহণযোগ্যতাকেও বিবেচনায় নিয়েছে। একারণেই দেশে-বিদেশে হংকংয়ের জেলা পরিষদের এবারের নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছিল।

হংকংয়ের চীনপন্থী প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যামের নিজের জন্যও এই নির্বাচন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ১২০০ সদস্যের যে কমিটি এই পদে নিয়োগ দেওয়ার কাজটি করেন তাদের মধ্যে ১১৭ জন আসেন জেলা কাউন্সিলগুলো থেকে। ফলে সরকারবিরোধীরা জেলা কাউন্সিল নির্বাচনে বড় আকারে জয়ী হওয়ায় তা ক্যারি ল্যামের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ খানিকটা ঝুঁকির মুখে পড়ে গেল।

নির্বাচনে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হন হংকংয়ের ৪.১ মিলিয়ন বাসিন্দা, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। এদের মধ্যে ২.৯ মিলিয়ন নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন, শতকরা হিসেবে যা ৭১ শতাংশ। ২০১৫ সালের আগের নির্বাচনে এই হার ছিল মাত্র ৪৭ শতাংশ।

ভোটদানের জন্য সতীর্থদের সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রপন্থীদের আন্দোলনের প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠা তরুণ জোশুয়া অং (Image: Reuters)

নির্বাচনে আলোচিত বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীরা

মোট ১৮টি জেলা কাউন্সিলের ৪৫২ টি পদের জন্য ১০০০ জনেরও প্রার্থী প্রতিদ্বন্দীতা করেন এবারের নির্বাচনে। গ্রামীণ এলাকার জন্য আরও ২৭ টি পদ সংরক্ষিত ছিল।

জেলা কাউন্সিলগুলোর এই সাড়ে চারশ পদের বেশিরভাগই এতদিন চীনপন্থী দলগুলোর দখলে ছিল। কিন্তু এবার তাদের আধিপত্য মুছে দিয়ে সিংহভাগ পদেই জয় পেয়েছে সরকারবিরোধী প্রার্থীরা।

সরকারি দলের অন্যতম আলোচিত সদস্য জুনিয়াস হো পরাজিত হয়েছেন এবারের নির্বাচনে। তিনি চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের বলপ্রয়োগের সমর্থনে বক্তব্য দিয়ে আলোচনার জন্ম দেন। এছাড়া গত জুলাইয়ে এক ভিডিওতে তাকে চীনভিত্তিক অপরাধমূলক সংগঠন ‘ত্রিয়াদ’-র কয়েকজন দুষ্কৃতীর সাথে হাত মেলাতে দেখা যায়, যারা এর কয়েকদিন পরই হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ওপর হামলা চালায়।

আবার হংকংয়ের সবচেয়ে বড় চীনপন্থী দলের সভানেত্রী স্ট্যারি লি ওয়েই-কিং তার আসন ধরে রাখতে পেরেছেন।

সরকারবিরোধী আন্দোলন আয়োজনকারীদের অন্যতম, হংকংয়ের ‘সিভিল হিউম্যান রাইটস ফ্রন্ট’ সংস্থার প্রধান জিমি শাম জীবনের প্রথম নির্বাচনেই সরকারদলীয় প্রার্থীকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন।

এদিকে হংকংয়ের সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রধান মুখ হয়ে ওঠা তরুণ জোশুয়া অংয়ের নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ করা হলেও তার পরিবর্তে দাঁড়ানো সরকারবিরোধী প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।

এক টুইট বার্তায় জোশুয়া অং নির্বাচনের ফলাফলকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।