বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের

বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস (Image: Reuters)

নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে শুরু হওয়া চলমান বিক্ষোভের জেরে পদত্যাগ করলেন বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস।

গত ২০ অক্টোবর বলিভিয়ায় অনুষ্ঠিত হয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তিন মেয়াদে প্রায় ১৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসও চতুর্থবারের জন্য প্রতিদ্বন্দীতা করেন এই নির্বাচনে।

তবে নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তোলে দেশটির বিরোধী দলগুলো। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এতে ‘স্পষ্ট জালিয়াতি’-র অভিযোগ আনে। দেশি-বিদেশি চাপের মুখে অভিযোগগুলো মেনে নিয়ে নতুন করে আবার নির্বাচনের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস।

কিন্তু বিরোধী দলগুলো প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ দাবি করে। তাদের সমর্থকেরা রাজপথে নেমে এলে অরাজকতা সৃষ্টি হয় দেশজুড়ে। প্রেসিডেন্টের কয়েকজন সহযোগীও আক্রান্ত হন বিক্ষোভে। তারা জানান, তাদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে আন্দোলনকারীরা।

এমন অবস্থায় বলিভিয়ার পুলিশ ও সেনাবাহিনীও সরকারের পক্ষ ত্যাগ করে। দুই বাহিনীর প্রধান প্রেসিডেন্টের প্রতি পদত্যাগের আহবান জানালে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিতে বাধ্য হন ইভো মোরালেস।

টেলিভশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনারা আমাদের ভাই ও বোনদের ওপর হামলা করা থামান। আগুন জ্বালানো বন্ধ করুন, আক্রমণ চালানো বন্ধ করুন”।

এদিকে শুধু প্রেসিডেন্টই নন, তার সাথে ভাইস প্রেসিডেন্ট আলভারো গ্রাসিয়া লিনেরা এবং বলিভিও সংসদের স্পীকার আদ্রিয়ানা সালভাতিয়েরাও পদত্যাগ করেছেন।

ঘটনাক্রম

২০০৬ সালে আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত প্রথম ব্যক্তি হিসেবে বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ইভো মোরালেস। ২০০৯ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনেও জয়ী হন মোরালেস।

দেশটির সংবিধানে একজন ব্যক্তির দু’বারের বেশি প্রেসিডেন্ট হতে না পারার যে বিধান অতীতে সংযুক্ত ছিল, নিজের দ্বিতীয় মেয়াদে তা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন ইভো মোরালেস।

সেইমত ২০১৬ সালে বলিভিয়ায় এক গণভোটের আয়োজন করেন প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস। কিন্তু গণভোটে মোরালেসের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে বলিভিয়ার জনগণ। প্রেসিডেন্ট মোরালেস নিজের ইচ্ছা পূরণে অন্য পন্থা অবলম্বন করেন।

২০১৭ সালে তিনি প্রস্তাবটি পেশ করেন বলিভিয়ার সাংবিধানিক আদালতে। সংবিধান ও আগের বছর হওয়া গণভোটের ফলাফলের বিপরীতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট মোরালেসের প্রস্তাবকে স্বীকৃতি দেয় সাংবিধানিক আদালত।

এর ধারাবাহিকতায় গত ২০ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বলিভিয়ায়।

নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই ফল গণনা ও ঘোষণা করতে শুরু করে দেশটির নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ। কিন্তু একপর্যায়ে ফল ঘোষণা প্রায় ২৪ ঘন্টার জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে চূড়ান্ত ফলাফলে দেখানো হয়, প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনের চেয়েও ১০ শতাংশ ভোট বেশি পেয়েছেন।

বিতর্কিত এই ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলিভিয়ার বিরোধীদলগুলো। তারা নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে রাজপথে আন্দোলন শুরু করে। এতে এখন পর্যন্ত অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছে বহু মানুষ। ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।

এমন অবস্থায় ২০ অক্টোবরের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এতে অনিয়মের অভিযোগ আনে। এরপর বলিভিয়ার সেনাপ্রধান উইলিয়াম কালিম্যান প্রেসিডেন্টের প্রতি পদত্যাগের আহবান জানান। প্রেসিডেন্ট মোরালেসের সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীও বিক্ষোভের ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ দেখিয়ে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন।

আর তারপরই ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন টানা প্রায় ১৪ বছর দায়িত্ব পালন করা বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস।

প্রেসিডেন্ট মোরালেসের পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই উৎসবে মেতে ওঠে আন্দোলনরত বিক্ষোভকারীরা। রাস্তায় নেমে তারা নেচে, গেয়ে, শ্লোগান দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করে। বিরোধী দলনেতা কার্লোস মেসা তাদেরকে অভিনন্দন জানান।

অন্যদিকে বলিভিয়ার প্রেসিডেন্টকে আন্দোলনের মাধ্যমে এভাবে ক্ষমতাচ্যুত করাকে ‘ক্যু’ হিসেবে অভীহিত করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইভো মোরালেসের ঘনিষ্ঠ মিত্র প্রতিবেশী কিউবা ও ভেনেজুয়েলা।