ব্রাজিলের কারাগারে বন্দীদের দুই গ্রুপে ভয়াবহ দাঙ্গায় নিহত ৫২

ব্রাজিলের একটি কারাগারে বিবাদমান দুই গ্রুপের মধ্যে চলা দাঙ্গায় কমপক্ষে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।

দেশটির পারা প্রদেশের আলতামিরা কারাগারের একটি ব্লকের বন্দীরা অন্য একটি ব্লক দখল করে নিলে সেই ব্লকের বন্দীদের সাথে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়।

মৃতদের মধ্যে ১৬ জন সংঘর্ষে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা যান আর বাকিরা আগুনের ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

ঘটনার সময় কারা দপ্তরের দু’জন কর্মকর্তাকে জিম্মি করা হয়েছিল, তাদের পরে মুক্ত করা হয়।

এদিন স্থানীয় সময় সকাল সাতটায় সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় যা চলে প্রায় দুপুর পর্যন্ত।

কারা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘কমান্ডো ভারমেলহো (রেড কমান্ড)’ এবং ‘কমান্ডো ক্লাস-এ (সিসিএ)’ নামের ওই গ্রুপ দুটি বহুদিন ধরেই বিবাদে জড়িয়ে ছিল। এদিন সকালে সিসিএ গ্রুপের সদস্যরা কারাগারের যে ব্লকে রেড কমান্ড গ্রুপের সদস্যরা থাকে তার দেয়ালে আগুন ধরিয়ে দেয়।

দেয়ালগুলো আগুন পরিবাহী হওয়ায় দ্রুতই তা ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশে। এতে ধোঁয়ায় ঢেকে যায় পুরো এলাকা। দমবন্ধ হয়ে মারা যায় কয়েকজন, আহত হয় বহু। আহতদের মধ্যে কয়েকজন পরে মারা যায় হাসপাতালে।

সংঘর্ষ থামানোর জন্য কারাগারের কর্মকর্তারা এগিয়ে গেলে তাদের মধ্যে দু’জনকে জিম্মি করে ফেলে বন্দীদের একটি অংশ। পরে অবশ্য তাদের ছেড়েও দেয় তারা। কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতিপক্ষ গ্রুপকে দমন করাই ছিল তাদের টার্গেট, কর্মকর্তারা নন। সেকারণেই জিম্মি করা অফিসারদের অল্প সময়ের মধ্যেই ছেড়ে দেয় তারা।

ঘটনার সময় গণমাধ্যমে তোলা ভিডিওচিত্রে দেখা যায় কারাগারের অন্তত একটি ভবন থেকে ধোঁয়া উড়ছে। আরেক ভিডিওতে দেখা যায় ভবনের ছাদে বন্দীরা পায়চারি করছে।

আলতামিরা কারাগারটির বন্দী ধারণ ক্ষমতা ২০০ জন হলেও সেখানে ৩০৯ জন বন্দীকে রাখা হয়েছিল বলে জানা গেছে। কর্তৃপক্ষ অবশ্য অতিরিক্ত বন্দী রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ব্রাজিলে কারাগারে দাঙ্গা নতুন কিছু নয়। অপরাধপ্রবণ দেশটিতে কারাবন্দীর সংখ্যা ৭০০,০০০ যা পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ। দন্ডপ্রাপ্ত অপরাধীরা কারাগারে গিয়ে নিজেদের গ্রুপ তৈরি করে নেয়। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই গ্রুপগুলোর মধ্যে হাতাহাতি, মারামারি থেকে শুরু করে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার ঘটনাও ঘটে নিয়মিত। কখনো কখনো এসব দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে একাধিক কারাগারেও।

এবছরই মে মাসে দেশটির আমাজোনাস প্রদেশে একই দিনে চারটি ভিন্ন ভিন্ন কারাগারে হওয়া সংঘর্ষে মারা যায় ৪০ জন।

২০১৭ সালের জানুয়ারী মাসে কয়েকটি কারাগারে একই রকম দাঙ্গার ঘটনায় ১৩০ জনের বেশি বন্দীর প্রাণ গিয়েছিল।

ব্রাজিলের কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জায়ার বোলসোনারো এ ধরনের সহিংসতা রোধে কারাগারগুলোকে কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে কাজটি তার জন্য সহজ হবেনা, কারণ দেশটির আইন অনুযায়ী কারাগারের নিয়ন্ত্রণ থাকে প্রাদেশিক সরকারগুলোর হাতে।

কেন এত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে ব্রাজিলের কারাগারগুলোতে?

১. ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দী রাখা

লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে অপরাধপ্রবণতার হার পৃথিবীর অন্যান্য অনেক অঞ্চলের চেয়ে বেশি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বন্দীদের সংখ্যাও এখানে বেশি। ব্রাজিল রয়েছে এই তালিকায় ওপরের দিকেই। কিন্তু কারাগারের সংখ্যা অপর্যাপ্ত হওয়ায় অতিরিক্ত বন্দীর সমস্যায় জেরবার দেশটির সিংহভাগ কারাগারই।

ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বন্দী থাকায় কারাগারগুলোতে অনেক সময়ই বিবাদমান গ্রুপগুলোকে আলাদা করে রাখা যায়না। এছাড়া খাবার, বিছানার মত প্রয়োজনীয় জিনিসের অপ্রতুলতাও ছোটখাট সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয় বন্দীদের।

২. গ্যাং কালচার

ব্রাজিলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক অপরাধের মত গ্যাংকেন্দ্রিক অপরাধের মাত্রাও যথেষ্ঠ বেশি। কারাগারের বাইরে এসব অপরাধী গ্যাং তৈরি করে অপরাধ করায় অভ্যস্ত বলে কারাগারে ঢুকেও সমমনাদের নিয়ে গ্রুপ তৈরি করে নেয় তারা। আর গ্রুপের সংখ্যা একাধিক হলেই আধিপত্য বিস্তারের তাগিদে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে তারা।

৩. তহবিলের অপর্যাপ্ততা

ব্রাজিলে কারাগারগুলোতে সরকারের বরাদ্দ আশানুরুপ নয়। অনেক সময়ই দেখা যায় কারারক্ষীদের প্রশিক্ষণের অভাব আছে অথবা সরঞ্জামে রয়েছে ঘাটতি। ফলে দূর্ধষ বন্দীদের মোকাবেলায় অনেক সময়ই বেগ পেতে হয় তাদের। পরিস্থিতি সময়মত, সঠিক পন্থায় সামলাতে না পারার কারণে ছোটখাট ঘটনাও অনেক সময় রুপ নেয় বড় সংঘাতে।