মারা গেলেন ‘বেইজিংয়ের কসাই’ সাবেক চীনা প্রধানমন্ত্রী লি পেং

চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি পেং (Image: Reuters)

১৯৮৯ সালে তিয়েনানমান স্কোয়ারে সেনা নামিয়ে নির্মমভাবে ছাত্র আন্দোলন দমনের জন্য কুখ্যাতি পাওয়া চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি পেং মারা গেছেন।

সোমবার সন্ধ্যায় বেইজিংয়ে ৯০ বছর বয়সে মারা যান ৮০ ও ৯০ এর দশকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একাধিক শীর্ষ পদ সামলানো এই নেতা।

১৯৮৯ সালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন দাবিতে বেইজিংয়ের রাজপথে নেমে এসেছিল দেশটির ছাত্ররা। তারা জড়ো হয় রাজধানীর তিয়েনানমান স্কোয়ারে। ধীরে ধীরে তাদের আন্দোলনে যোগ দেয় শ্রমিক, বুদ্ধিজীবিসহ সমাজের অন্যান্য অংশের মানুষও। তাদের দাবি মানার পরিবর্তে আন্দোলন দমন করার সিদ্ধান্ত নেয় ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি। ৪ জুন তিয়েনানমান স্কোয়ারে পাঠানো হয় সেনাবাহিনী। শুধু লাঠিচার্জ আর গুলিবর্ষণই নয়, আন্দোলনকারীদের ওপর ট্যাংকও চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেদিন। সেই রাতের নারকীয় ওই অভিযানে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। অবশ্য চীন সরকার দাবি করে, মৃতের সংখ্যা কয়েক’শ।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্মম সেই সেনা অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল লি পেংয়ের। যার কারণে সেই রাতে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের জন্য দায়ী করা হয় তাকেই। সমালোচকরা তাকে অভিহীত করে ‘বুচার অব বেইজিং’ (বেইজিংয়ের কসাই) নামে।

লি পেং আমৃত্যু সেদিন তার নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে ‘জরুরি ছিল’ বলে দাবি করে এসেছেন।

লি পেংয়ের মৃত্যুতে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা শিনহুয়া এক প্রতিবেদনে বলেছে, “তিয়েনানমান স্কোয়ারে অরাজকতা এবং প্রতিবিপ্লবী সহিংসতা বন্ধ করার জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজনীয় ছিল লি তাই নিয়েছিলেন।”

চীনের কমিউনিস্ট সরকার গত দু’দশক ধরেই তিয়েনানমান স্কোয়ারের ঘটনা নিয়ে যেকোন তৎপরতায় বিধিনিষেধ জারি করে রেখেছে। দেশটিতে এই সংক্রান্ত কোন প্রচার বা প্রকাশনা বা আয়োজন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে চীনের বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতি বছরই ৪ জুন তিয়েনানমান স্কোয়ারের গণহত্যার বার্ষিকী পালন করা হয়।

লি পেংয়ের জন্ম ১৯২৮ সালে চীনের সিচুয়ান প্রদেশে। তার বাবা ছিলেন একজন কমিউনিস্ট বিপ্লবী যিনি ১৯৩১ সালে দেশটির জাতীয়তাবাদী সংগঠনের হাতে নিহত হন।

মাত্র তিন বছর বয়সে পিতৃহারা লি পেংকে দত্তক নেন গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ঝু এনলাই ও তার স্ত্রী দেং ইংচাও।

তরুণ বয়সে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে লি পেং মস্কোতে চলে যান। সেখানে তিনি হাইড্রোপাওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে প্রশিক্ষণ নেন।

কয়েক বছর পর চীনে ফিরে এসে লি যোগ দেন রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থায়।

এর পরবর্তী বছরগুলোতে কমিউনিস্ট পার্টিতে লি পেংয়ের উত্থান ঘটতে থাকে। বিশেষ করে ৭০’র দশকে দেং শিয়াওপিং-র নেতৃত্বকালে। শুরুতে সরকারের শক্তি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা লি পেং প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেন ১৯৮৭ সালে।

তখন থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ১১ বছর চীনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন লি পেং। আর ১৫ বছর ধরে ছিলেন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য হিসেবে।

তার সময়ে চীনের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অগ্রগতি সাধিত হয়। তবে তিয়েনানমান স্কোয়ারের ঘটনা অন্তত বহির্বিশ্বে তার বাকি সব অর্জনকে ম্লান করে দেয়।