নজিরবিহীন বিক্ষোভে সংসদে ভাষণই দিতে পারলেন না হংকংয়ের ক্যারি ল্যাম

নজিরবিহীন বিক্ষোভে সংসদে ভাষণই দিতে পারলেন না হংকংয়ের ক্যারি ল্যাম
সংসদে ভাষণ শেষ না করেই ফিরে যাচ্ছেন হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যাম, কাছেই এক সাংসদ তার উদ্দেশ্যে ব্যাঙ্গাত্মক প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে ধরেছেন (Image: Reuters)
শহরজুড়ে কয়েকমাস ধরে চলা গণবিক্ষোভের স্বাদ এবার সংসদের ভেতরেও পেলেন হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যাম।

গতকাল হংকংয়ের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন চলার সময় ভাষণ দেওয়ার কথা ছিল নগররাষ্ট্রটির প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যামের। বক্তৃতা দেওয়ার জন্য যখন তিনি অধিবেশন কক্ষের মাঝখান দিয়ে মঞ্চের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা প্ল্যাকার্ড হাতে চিৎকার করে তার বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন।

নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় বাধা পেরিয়ে মঞ্চে উঠে বক্তৃতা দেওয়া শুরু করেন ক্যারি ল্যাম। কিন্তু বিরোধী সদস্য তীব্র হট্টগোলে বক্তব্য চালিয়ে যেতে পারেননি তিনি। বাধ্য হয়ে ভাষণ অসমাপ্ত রেখেই অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন ক্যারি ল্যাম।

সংসদে পেশ করতে না পারলেও অসম্পূর্ণ বক্তৃতাটি পরে এক ভিডিওর মাধ্যমে প্রচার করেন হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যাম।

এদিকে ক্যারি ল্যামের ভাষণকে কেন্দ্র করে সংসদে বিশৃঙ্খলার প্রেক্ষিতে বিতর্কিত বহিঃসমর্পণ বিলটিও আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিলের জন্য সংসদে উত্থাপন করা যায়নি।

ক্যারি ল্যাম সরকারের প্রস্তাবিত বহিঃসমর্পণ বিলের বিরুদ্ধে গত কয়েক মাস ধরে হংকংয়ের রাস্তায় নেমে নজিরবিহীন বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন হংকংয়ের সাধারণ মানুষ।

চীনের অন্তর্গত হয়েও সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশ হংকং গণতন্ত্র, মানবাধিকারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে আলাদা স্বাধীনতা ভোগ করে আসছে। এমনকি চীন সরকারের কঠোর সমালোচনাও হংকংয়ের নাগরিকেরা নির্ভয়ে করতে পারেন, যেটি চীনের মূল ভূখন্ডে কল্পনাও করা যায়না।

হংকংকে এসব স্বাধীনতা নিরবিচ্ছিন্নভাবে দেওয়ার শর্তেই ১৯৯৭ সালে হংকংকে চীনের হাতে হস্তান্তর করে বিদায় নিয়েছিল ব্রিটেন। মূলত এই চুক্তির কারণেই চীনের সমালোচনা করা হংকংয়ের কোন নাগরিকের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনা চীন।

হংকংয়ের চীনপন্থী বর্তমান প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যাম কয়েক মাস আগে যে বহিঃসমর্পণ আইন প্রস্তাব করেন, তাতে হংকংয়ের কোন নাগরিক চীনের সমালোচনা করলে তাকে চীনের হাতে তুলে দেওয়া বিধান রাখা হয়।

আর এতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন হংকংয়ের সাধারণ মানুষ। অবিলম্বে এই বহিঃসমর্পণ আইন বাতিলের দাবিতে হংকংয়ের কেন্দ্রস্থলে জড়ো হতে শুরু করেন সেখানকার লক্ষ লক্ষ অধিবাসী। তখন থেকে আজ অব্দি কার্যত অচলাবস্থা বিরাজ করছে হংকংয়ে।

প্রবল বিক্ষোভের মুখে গত জুলাই মাসে বিতর্কিত আইনটি বাতিলের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন ক্যারি ল্যাম।

এরপর এবারই প্রথম সুযোগ ছিল সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলটি বাতিল করার। কিন্তু অধিবেশনের প্রথমদিনই এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ায় সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হল।

প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যামের ভাষণ বিঘ্নিত হওয়ার পর বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা তাদের প্রতিক্রিয়ায় হংকংয়ের বর্তমান সংকটের জন্য ক্যারি ল্যামকেই দায়ী করেন।

তাদেরই একজন তানায়া চ্যান বলছিলেন, “ক্যারি ল্যামের দু’হাতেই রক্ত লেগে আছে। আমি আশা করব তিনি বিলটি প্রত্যাহার করে নিজে দ্রুত প্রদত্যাগ করবেন। কারণ হংকং শাসন করার যোগ্যতা তার নেই। প্রধান নির্বাহী পদের জন্য তিনি আর উপযুক্ত নন।”

অন্যদিকে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা ক্যারি ল্যামের ভাষণ বিঘ্নিত করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছেন, হংকংয়ের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎের জন্য এই ভাষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

সংসদে বাধাগ্রস্থ হবার পর ভিডিওতে দেওয়া ভাষণে ক্যারি ল্যাম ‘এক দেশ, দুই নীতি’ ব্যবস্থার প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। অভিন্ন দেশ হয়েও চীন ও হংকংয়ের পৃথক শাসনব্যবস্থাই ‘এক দেশ, দুই নীতি’ নামে পরিচিত।

তবে হংকংকে চীন থেকে আলাদা করে স্বাধীন রাষ্ট্র বানানোর যেকোন আকাঙ্খার প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ক্যারি ল্যাম বলেন, “এমন কোন প্রচেষ্টা বরদাস্ত করা হবেনা।”

বক্তৃতায় হংকংয়ের বাসিন্দাদের জন্য বেশ কয়েকটি আবাসন ও পরিকাঠামো প্রকল্পের ঘোষণা দেন তিনি।

তবে ভাষণে চলমান বিক্ষোভ এবং নির্বাচনী সংস্কারসহ আন্দোলনকারীদের বিভিন্ন দাবির ব্যাপারে কিছু বলেননি ক্যারি ল্যাম। ভাষণ পরবর্তী সংবাদ সন্মেলনে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নির্বাচনী ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার সময় এটা নয়।” তিনি আরও বলেন, “হংকংয়ে বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যম্যের স্বাধীনতা রয়েছে এবং তাতে চীনের কোন হস্তক্ষেপ নেই।”