হংকং সীমান্তে চীনা আধাসামরিক বাহিনীর মহড়া, বিক্ষোভ অব্যাহত

শেনঝেং স্পোর্টস কমপ্লেক্সের বাইরে সারি সারি সামরিক ট্রাক, দূরের সেতুটি পার হয়ে হংকংয়ের মূল ভূখন্ডে ঢুকে পড়তে যেগুলোর সময় লাগবে মাত্র কয়েক মিনিট (Image : Reuters)

চীন অবশ্য বলছে, এর সাথে দ্বীপরাষ্ট্রটিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সরকারবিরোধী আন্দোলনের কোন সম্পর্ক নেই।

চীনের আধাসামরিক বাহিনী ‘পিপলস আর্মড পুলিশ’ এর সদস্যরা হংকংয়ের সাথে দেশটির সীমান্তবর্তী এলাকায় এক বিশেষ নিরাপত্তা মহড়ায় অংশ নিয়েছে। দেশটির শেনঝেন প্রদেশের একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত এই মহড়াকে হংকংয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশ্যে এক পরোক্ষ হুমকি হিসেবে মনে করা হচ্ছে।

হংকংয়ে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের মধ্যেই গত কয়েকদিন ধরে ওই ক্রীড়া কমপ্লেক্সে ঘাঁটি গেড়ে রয়েছে চীনের আধাসামরিক এই বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য। দ্বীপরাষ্ট্র হংকংয়ে সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল গণবিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে এর বিপক্ষে কখনো নরম সুরে, কখনো কড়া ভাষায় বিবৃতি দিয়ে এসেছে চীন। কিন্তু তাদের আহবান বা হুমকি, কোনটিতেই কর্ণপাত না করে হংকংয়ের আন্দোলন বরং দিনকে দিন আরও তীব্র হয়েছে।

এরকম পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে হংকংয়ের সাথে সীমান্ত লাগোয়া প্রদেশ শেনঝেনের এই ক্রীড়া কমপ্লেক্সে সামরিক পুলিশের অস্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন করে চীন। গত কয়েক দিনে সামরিক ট্রাকে করে দফায় দফায় বিপুল সংখ্যক আধাসামরিক সেনা মোতায়েন করা হয় এই ঘাঁটিটিতে।

চলমান হংকং আন্দোলন এবং তার প্রেক্ষিতে সীমান্তে চীনের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে। হংকংয়ের বিক্ষোভ অনেককেই ১৯৮৯ সালে চীনের ‘তিয়েনানমান স্কোয়ার’-র আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দিলেও, এটির শেষ পরিণতি যেন সেটির মত না হয়, তাই প্রত্যাশা সকলের।

শেনঝেং স্পোর্টস কমপ্লেক্সের ভেতরে চীনা আধাসামরিক বাহিনীর মহড়া (Image : Reuters)

গত শতকের আশির দশকের শেষভাগে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এসেছিল দেশটির জনগণ। প্রবল সেই গণবিক্ষোভের আঁচ পৌছে যায় বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও। আরেক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র চীনের ছাত্ররাও নিজেদের দেশে গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকারের দাবিতে বেইজিংয়ের কেন্দ্রস্থল তিয়েনানমান স্কোয়ারে অবস্থান নিয়ে শুরু করে বিক্ষোভ।

কয়েকদিনের মধ্যেই ছাত্রদের সেই আন্দোলনে শিক্ষক, শ্রমিক, পেশাজীবি, শিল্পীসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যোগ দিতে শুরু করে। বেইজিং ছাড়িয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে চীনের আরও অনেক শহরে। ১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর এত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে আর কখনো পড়েনি দেশটির সরকার।

শুরুর দিকে বিক্ষোভকারীদের দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আন্দোলন বশে আনার চেষ্টা করেছিল চীন সরকার। কিন্তু তাতে কাজ না হওয়ায় এবং দিনকে দিন পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে থাকায় শেষ পর্যন্ত বল প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় চীনা কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯৮৯ সালের ৪ জুন তিয়েনানমান স্কোয়ারে নামানো হয় সেনা। চীনা সেনাবাহিনীর রক্তক্ষয়ী সেই অভিযানে সেদিন মারা গিয়েছিল কয়েক হাজার মানুষ। আহত হন আরও বহু। দেশজুড়ে গ্রেপ্তার করা হয় হাজার হাজার নাগরিককে। এদের অনেকেই এখনও বন্দী দেশটির কারাগারগুলোতে। চীন অবশ্য সেদিনের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা কয়েকশ বলে দাবি করে এসেছে।

হংকংয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকা সরকার বিরোধী আন্দোলন দমনে শেষ পর্যন্ত সেরকমই কোন কঠোর রাস্তায় চীন আবারও হাঁটবে, নাকি সেনা মোতায়েন ও মহড়ার আয়োজন নেহাতই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ভয় দেখানোর জন্য, তা বলার সময় এখনও আসেনি।

চীন অবশ্য তাদের আধাসামরিক বাহিনীর মহড়া সম্পর্কে এক বিবৃতিতে বলেছে, এই মহড়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল অনেকদিন আগেই। এটির সাথে হংকংয়ে চলা বিক্ষোভের সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই। অবশ্য এর কয়েক ঘন্টা আগে চীন আরেক বিবৃতিতে বলেছিল, হংকংয়ের আন্দোলনের মধ্যে তারা সন্ত্রাসবাদের বীজ দেখতে পাচ্ছেন।

মহড়ার সময় পুরো এলাকায় সত্যিকারের দাঙ্গার আবহ সৃষ্টি করা হয়। পুলিশের পরনে ছিল পুরোদস্তুর সামরিক সাজপোশাক। এক হাতে ধরা লাঠি, আরেক হাতে ঢাল। কারও কারও হাতে টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ার বন্দুক। অংশগ্রহণকারীদের একটি অংশ আন্দোলনকারী সেজে বিক্ষোভের অভিনয় করে, আর আরেক অংশ তাদের নিবৃত্ত করার মহড়া দেয়।

মহড়াস্থলের বাইরে শেনঝেন বে স্টেডিয়ামের পার্কিং এলাকায় তখন সারে সারে দাঁড় করানো বিপুল সংখ্যক সাঁজোয়া যান ও ট্রাক। এর কিছু দূরেই চীন ও হংকংয়ের মধ্যে সংযোগকারী একটি সেতুর অবস্থান, চীন সরকার সিদ্ধান্ত নিলে ক্রীড়া কমপ্লেক্স থেকে রওনা হয়ে যেটির ওপর দিয়ে হংকংয়ে প্রবেশ করতে চীনা আধাসামরিক বাহিনীর সময় লাগবে মাত্র কয়েক মিনিট।

এসব ঘটনা ও পাল্টা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হংকং পুলিশের একজন কর্তা ইয়াং ম্যান-পুনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, দ্বীপরাষ্ট্রটির পুলিশ কি আদৌ চলমান অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে নাকি চীনা হস্তক্ষেপ অবধারিত? উত্তরে তিনি বেশ জোর দিয়েই সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা আত্মবিশ্বাসী যে হংকংয়ের আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার সম্পূর্ণ সক্ষমতা আমাদের পুলিশ বাহিনীর রয়েছে।”