পুনঃনির্বাচনে করিয়েও ইস্তানবুল জিততে পারলেননা এরদোগান

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়ুপ এরদোগান (Image: Reuters)

পুনঃনির্বাচন করিয়েও মুখরক্ষা হলনা তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়ুপ এরদোগানের। গত মার্চে দেশটিতে অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনে রাজধানী আঙ্কারা ও গুরুত্বপূর্ণ শহর ইস্তানবুলে অপ্রত্যাশিতভাবে জয় পেয়েছিল বিরোধী ‘রিপাবলিকান পিপলস পার্টি’ (সিএইচপি)। আঙ্কারায় স্পষ্ট ব্যবধানে হারলেও ইস্তানবুলে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের ক্ষমতাসীন ‘জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’ (একেপি) পরাজিত হয় সামান্য ভোটের ব্যবধানে। আর সেটিকেই পুঁজি করে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ইস্তানবুলে পুনঃনির্বাচনের দাবি তোলে ক্ষমতাসীন একেপি। তাতে সায় দিয়ে তুরস্কের সর্বোচ্চ নির্বাচনী কর্তৃপক্ষও ইস্তানবুলের মেয়র পদে পুনরায় নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিল।

তিন মাসের মাথায় গতকাল অনুষ্ঠিত হয় আলোচিত সেই পুনঃনির্বাচন। রাতভর গণনা শেষে দেখা যাচ্ছে, বিরোধীদল শুধু যে ইস্তানবুলের মেয়র পদটি আবারও ছিনিয়ে এনেছে তাই নয়, মার্চের নির্বাচনে তাদের প্রার্থী ইকরাম ইমামোগলু যেখানে পেয়েছি্লেন ৪৮.৭৯ শতাংশ ভোট, এবার তা আরো বেড়ে হয়েছে প্রায় ৫৪ শতাংশ।

ইস্তানবুলের নবনির্বাচিত মেয়র ইকরাম ইমামোগলু। প্রথমবার জিতেছিলেন, তিনমাস পর আবারও জিতলেন আরও বড় ব্যবধানে (Image: Reuters)

আগেরবার না মানলেও, এবারের স্পষ্ট ব্যবধানের ফলাফল প্রত্যাখান করার আর উপায় নেই ক্ষমতাসীন একেপি-র। সেইমত পরাজয় মেনে নিয়েছেন বিরোধী প্রার্থী বিন-আলি ইয়িলদিরিম, যিনি দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সংসদের সাবেক স্পিকারও। বিজয়ী মেয়র ইকরাম ইমামোগলুকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়ুপ এরদোগানও।

আলোচিত এই পুনঃনির্বাচনের ফলাফলটিকে দেখা হচ্ছে দেশটির প্রবল ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট রিসেপ এরদোগানের জন্য বড় একটি ধাক্কা হিসেবে। তিনি একবার মন্তব্য করেছিলেন “যে ইস্তানবুল জেতে, সে পুরো তুরস্কই জিতে নেয়।’’ সেই এরদোগানের জন্য তিন মাসে দু’বার চেষ্টা করেও ইস্তানবুল জিততে না পারাটা চরম অস্বস্তিকরই বটে।

একই পদে দ্বিতীয়বার বিজয়ী হওয়ার পর ইস্তানবুলের নবনির্বাচিত মেয়র ইকরাম ইমামোগলু এক ভাষণে এই জয়কে শুধু ইস্তানবুলের জন্যই নয়, পুরো দেশের জন্যও ‘নতুন সূচনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা ইস্তানবুল শহরের জন্য নতুন এক পাতা খুলতে যাচ্ছি, যেখানে থাকবে ন্যায়বিচার, সাম্য ও ভালবাসা।” তিনি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের উদ্দেশ্যে বলেন, “মি. প্রেসিডেন্ট, আমি আপনার সাথে মিলেমিশে কাজ করতে প্রস্তুত।”

গত মার্চের নির্বাচনে ইকরাম ইমামোগলুর জয়ের ব্যবধান ছিল ১৩,০০০। আর এবারের নির্বাচনে তা বেড়ে হয়েছে ৭৭৫,০০০। আগেরবার জয়ের পর তাকে নির্বাচিত হওয়ার সনদও দিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এমনকি তিনি মেয়র পদে দায়িত্ব পালন শুরুও করে দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট এরদোগানের দলের দাবির মুখে তার সনদ বাতিল করে দেয় তুরস্কের সর্বোচ্চ নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ।

পুনঃনির্বাচনের এই ফলাফল দেশটির ক্ষমতাসীন দল একেপি-র অভ্যন্তরে অসন্তোষ তৈরি করবে বলে মনে করা হচ্ছে। সেটা ইস্তানবুলের মত গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরাজিত হওয়ার জন্য যতটা, তার চেয়েও বেশি শহরটিতে জোর করে পুনঃনির্বাচন করানোর জন্য। বিক্ষুব্ধদের মতে, একে তো পুনঃনির্বাচনেও জিততে ব্যর্থ হওয়া, তার ওপর পরাজয়ের ব্যবধান আগের চেয়েও বেড়ে যাওয়ায় দেশবাসী তথা পুরো বিশ্বের সামনে দলকে হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়েছ। তাদের বক্তব্য, সব দিক হিসেব না করে পুনঃনির্বাচনের দাবি তোলাটা একেবারেই উচিৎ হয়নি দলের।

এমন প্রেক্ষিতে দলের মধ্যে এরদোগানের বিকল্প খুঁজে বের করার আলোচনাও শুরু হয়ে যেতে পারে বলে ধারণা অনেকের। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট পদে পরবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৩ সালে।

কারা ছিলেন নির্বাচনের প্রার্থী?

৪৯ বছর বয়সী ইকরাম ইমামোগলু ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ ‘রিপাবলিকান পিপলস পার্টি’-র প্রার্থী। তিনি এর আগে ইস্তানবুলের অন্তর্গত বেলিকদুজু জেলার মেয়র ছিলেন।

তবে মার্চের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তুরস্কের জাতীয় স্তরে তার নাম তেমন একটা শোনা যায়নি।

মেয়র পদে সরকারদলীয় প্রার্থী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক স্পীকার বিন-আলি ইয়িলদিরিম (Image: Reuters)

অন্যদিকে প্রধান প্রতিপক্ষ বিন-আলি ইয়িলদিরিম তুরস্কের ক্ষমতাসীন দল একেপি-র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। মে ২০১৬ থেকে জুলাই ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এরপরই দেশটি রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করে, ফলে প্রধানমন্ত্রী পদটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।

নতুন শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের পর ২০১৮ সালে জুলাইয়ে তুরস্কের সংসদের স্পীকার মনোনীত হন ইয়িলদিরিম। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত এ পদে ছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী ও স্পীকার হওয়ার আগে কয়েক দফায় দেশটির পরিবহন ও যোগাযোগ মন্ত্রীও ছিলেন তুরস্কের বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই পুনঃনির্বাচনটি?

শুধু ঐতিহাসিক বা প্রশাসনিক কারণেই নয়, তুরস্কের সাবেক রাজধানী ইস্তানবুলের রাজনৈতিক গুরুত্বও ব্যাপক।

দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়ুপ এরদোগান নিজে ইস্তানবুল শহরের মেয়র ছিলেন ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত। ২০০১ সালে তিনি আজকের ক্ষমতাসীন দল একেপি প্রতিষ্ঠা করেন। এই দল থেকে নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদে ছিলেন ২০০৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত। তার সময়েই তুরস্কে রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় এবং তিনিই নতুন ব্যবস্থায় দেশটির প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন ২০১৪ সালে।

পুরনো শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি ও সংসদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া থাকলেও নতুন ব্যবস্থায় তা অনেকটাই কুক্ষিগত হয়ে পড়ে রাষ্ট্রপতির হাতে। সেকারণেই প্রেসিডেন্ট পদে বসার পর থেকেই একটু একটু করে স্বৈরাচারী আচরণের অভিযোগ উঠতে শুরু করে রিসেপ এরদোগানের বিরুদ্ধে। বিরোধী মতকে দমনের চেষ্টা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচার ব্যবস্থায় নাক গলানো, বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার মত গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হন তিনি।

এসবের মধ্যেই ২০১৬ সালের জুলাইয়ে একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা হয় প্রেসিডেন্ট  এরদোগানের বিরুদ্ধে। তবে তা ব্যর্থ করে দিয়ে ক্ষমতায় টিকে যান এরদোগান। অভ্যুত্থান চেষ্টায় জড়িত থাকার সন্দেহে হাজার হাজার নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়, নির্যাতন চালানো হয়, ফাঁসি-জেল-জরিমানা-বরখাস্তসহ নানাভাবে শাস্তি দেওয়া হয়।

সব মিলিয়ে তার ১১ বছরের প্রধানমন্ত্রীত্বকাল মোটামুটি সুস্থিরভাবে পার করতে পারলেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে গত ৫ বছরে যথেষ্ঠ অস্থিরতার মোকাবেলা করতে হয়েছে ৬৫ বছর বয়সী এই নেতাকে। তবে তার আমলে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তুরস্কের গুরুত্ব ও অংশগ্রহণ বাড়ে উল্লেখযোগ্যভাবে। অর্থনীতিও মোটের ওপর ছিল নিয়ন্ত্রণে।

কিন্তু এরদোগানের প্রশাসন নির্বাচনী ব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের কর্মকান্ডে হস্তক্ষেপ করে বলে অভিযোগ থাকায় দেশটির মানুষ তাদের প্রেসিডেন্ট, সরকার বা সরকারি দলকে কতটা সমর্থন করেন তা অনেক সময়ই বাইরে থেকে বোঝার উপায় থাকেনা।

একারণেই মার্চে হয়ে যাওয়া মেয়র নির্বাচনের দিকে নজর ছিল গোটা বিশ্বের। প্রেসিডেন্ট এরদোগান অতীতে যে ইস্তানবুলের মেয়র ছিলেন আর বর্তমানে যে আঙ্কারায় বসে দেশ শাসন করেন, সেই দুই প্রধান শহরের নির্বাচনকে কার্যত তার জনপ্রিয়তা পরীক্ষার মাপকাঠি হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

আর সেই পরীক্ষায় প্রবল পরাক্রমী তুর্কি প্রেসিডেন্ট যে অনেকটাই ধরাশায়ী, তা এখন আর বলার অপেক্ষা রইলনা।