এবছর শান্তিতে নোবেল জিতলেন ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যাবি আহমেদ

এবছর শান্তিতে নোবেল জিতলেন ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যাবি আহমেদ
ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যাবি আহমেদ, প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার সাথে কয়েক দশকের সংঘাত মিটিয়ে জিতলেন নোবেল শান্তি পুরষ্কার (Image: Reuters)

ঘোষিত হল এ বছরের নোবেল শান্তি পুরষ্কার বিজেতার নাম। ২০১৯ সালের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক এই পুরষ্কার জিতে নিয়েছেন উত্তর আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যাবি আহমেদ।

নোবেল কমিটির ভাষায় ‘শান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা’-র স্বীকৃতিস্বরূপ অ্যাবি আহমেদকে নোবেল শান্তি পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়েছে।

গত বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার সাথে কয়েক দশক ধরে চলা সীমান্ত সংঘাত নিরসন করে বিশ্বব্যাপী আলোচিত হন অ্যাবি আহমেদ। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ইথিওপিয়া থেকে বেরিয়ে ইরিত্রিয়ার স্বাধীনতা লাভের সময় থেকেই দু’দেশের মধ্যে সীমান্তের কিছু এলাকা নিয়ে সংঘাত চলে আসছিল। যাতে আজ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন দু’পক্ষের প্রায় ৭০ হাজার মানুষ।

আগামী ডিসেম্বর মাসে নরওয়ের রাজধানী অসলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরষ্কার হস্তান্তর করা হবে ৪৩ বছর বয়সী ইথিওপিও প্রধানমন্ত্রীর হাতে। কাকতালীয়ভাবে, অ্যাবি আহমেদ হলেন শান্তিতে বিশ্বের সর্বোচ্চ এই সম্মানের ১০০ তম বিজেতা।

ঐ অনুষ্ঠানে ‘নোবেল শান্তি পুরষ্কার’ এর অংশ হিসেবে অ্যাবি আহমেদের হাতে তুলে দেওয়া হবে আলফ্রেড নোবেলের (যার নামে নোবেল পুরষ্কার প্রবর্তিত) প্রতিকৃতি সংবলিত পদক এবং নোবেল কমিটির সনদপত্র। এছাড়া পুরষ্কারমূল্য হিসেবে প্রায় নয় লক্ষ মার্কিন ডলারও পাবেন অ্যাবি।

বিশ্বের সেরা এই স্বীকৃতি পাওয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় অ্যাবি আহমেদ জানান, তিনি একই সাথে ‘বিনম্র ও শিহরিত’।

নরওয়ের নোবেল কমিটির সচিবের সাথে এক ফোনালাপে অ্যাবি আহমেদ বলেন, “আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। এই পুরষ্কার দেওয়া হয়েছে আফ্রিকাকে, দেওয়া হয়েছে ইথিওপিয়াকে। আমি কল্পনা করতে পারছি এটি আফ্রিকার নেতাদের কিভাবে অনুপ্রাণিত করবে এই মহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আরও কাজ করতে।”

এবছরের নোবেল শান্তি পুরষ্কারের জন্য ২২৩ জন ব্যাক্তি এবং ৭৮ টি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মোট ৩০১ টি নাম বিবেচনাধীন ছিল। এদের মধ্যে পরিবেশ আন্দোলনের জন্য সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পাওয়া কিশোরী গ্রেটা থানবার্গের নাম সবচেয়ে আলোচিত ছিল।

তবে নোবেল কমিটি বাস্তবে কাদের নাম শেষ পর্যন্ত বিবেচনায় রেখেছিল তা জানার উপায় আপাতত নেই। কারণ নোবেল ফাউন্ডেশনের বিধি অনুযায়ী, পুরষ্কারের জন্য সর্বশেষ মনোনীতদের নাম পরবর্তী ৫০ বছর পর্যন্ত গোপন রাখা হয়।

ঠিক কি ভূমিকা রেখেছেন অ্যাবি আহমেদ?

গোটা আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম তরুণ রাষ্ট্রনেতা অ্যাবি আহমেদ। ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে মাত্র ৪২ বছর বয়সে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী হন তিনি।

ক্ষমতায় বসার পরপরই নিয়ন্ত্রণমূলক শাসন ব্যবস্থা থেকে স্বাধীন ও উন্মুক্ত ব্যবস্থায় ইথিওপিয়াকে নিয়ে যান প্রধানমন্ত্রী অ্যাবি। অতীতে রাজনৈতিক কারণে বন্দী হওয়া বহু মানুষকে কারাগার থেকে মুক্তি দেন তিনি। দেশত্যাগ করা রাজনৈতিক কর্মীদের দেশে ফেরার সুযোগ করে দেন। সরকার ও প্রশাসনের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের নিয়োগ দেয়া হয়। ইথিওপিয়ার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা কমিয়ে আনেন তিনি।

তবে মাত্র এক বছরের শাসনকালে অ্যাবি আহমেদের সবচেয়ে বড় সাফল্য নিঃসন্দেহে প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার সাথে ইথিওপিয়ার সম্পর্ক স্বাভাবিক করা।

ক্ষমতায় বসেই ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্টের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী। কয়েক মাসের সফল কুটনৈতিক তৎপরতার শেষে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে দু’দেশের মধ্যে চলা কয়েক দশকের বৈরিতার অবসান ঘটান অ্যাবি আহমেদ।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

নোবেল শান্তি পুরষ্কার বিজয়ী হিসেবে নাম ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই সারা পৃথিবী থেকে অভিনন্দন বার্তা পেতে শুরু করেছেন অ্যাবি আহমেদ। আফ্রিকার প্রতিবেশী দেশগুলোই তার এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি আপ্লুত।

সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট মোহাম্মেদ ফারমাজো ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে এই পুরষ্কারের ‘যোগ্য বিজয়ী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়েহ নোবেল শান্তি পুরষ্কার পাওয়ায় ‘উষ্ণ অভিনন্দন’ জানিয়েছেন  অ্যাবি আহমেদকে।

ঘানার প্রেসিডেন্ট নানা আকুফো-আদ্দো মন্তব্য করেন, “এই পুরষ্কার আমাদের এটাই মনে করিয়ে দেয় যে, শান্তি হল আফ্রিকাকে সফল করার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যাবি আহমেদের নেওয়া সংস্কার কার্যক্রম এবং শান্তির জন্য নেওয়া পদক্ষেপের প্রশংসা করলেও, সেগুলো পুরোপুরি অর্জনে আরও অনেক দূর যেতে হবে বলে মন্তব্য করেছে।