মুক্তি পেলেন ব্রাজিলের কারাবন্দী সাবেক প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা

ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা (Image: Reuters)

প্রায় ১৮ মাস কারাভোগের পর মুক্তি পেলেন ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা, অবশ্য সাময়িকভাবে। দূর্নীতির দায়ে দন্ডিত বামপন্থী এই নেতা শুক্রবার দেশটির কুরিটিবা কারাগার থেকে মুক্তির পর সেখানে উপস্থিত তার কয়েকশত সমর্থক তাকে শুভেচ্ছা জানান।

এর আগে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট এই মর্মে একটি রুলিং জারি করেছিল যে, কোন দন্ডিত ব্যক্তি তার সাজার বিরুদ্ধে আপিলের সবক’টি বিকল্প ব্যবহার করার আগ পর্যন্ত তাকে কারারুদ্ধ রাখা যাবেনা।

এই রুলিংয়ের প্রেক্ষিতেই দূর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত লুলা ডি সিলভাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেয় আদালত।

৭৪ বছর বয়সী লুলা ডি সিলভা ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মেয়াদকালে জনমুখী বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার সুবাদে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি।

তবে দূর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয় তার ভাবমূর্তি। লুলা ডি লিভা অবশ্য তার বিরুদ্ধে ওঠা এ অভিযোগগুলোকে বরাবরই অস্বীকার করে এসেছেন।

মুক্তিলাভের পর কারগারের বাইরে অপেক্ষমান সমর্থকদের উদ্দেশ্যে লুলা বলেন, “আমি ভাবতেও পারিনি যে আজ আমি সেইসব নারী ও পুরুষদের উদ্দেশ্যে কথা বলতে পারব, যারা গত ৫৮০ দিন ধরে বৃষ্টিতে হোক বা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরমে, এই কারাগারের কাছে এসে আমার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে সুপ্রভাত, শুভ অপরাহ্ন বা শুভ রাত্রি বলে গেছে”।

তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার প্রতিজ্ঞা করে বিচার ব্যবস্থার একাংশের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, এই অংশটি পরিকল্পিতভাবে বামপন্থাকে কলঙ্কিত করার কাজ করে যাচ্ছে।

গত বছর অনুষ্ঠিত ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলা ডি সিলভা সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের আগেই দূর্নীতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত তাকে কারাগারে পাঠায়। প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন লুলার কট্টর সমালোচক ডানপন্থী জায়ার বোলসোনারো।

বর্তমান প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক নীতির কঠোর সমালোচনা করে লুলা সমর্থকদের সামনে বলেন, “মানুষ ক্ষুধার্ত, তাদের স্থায়ী কর্মসংস্থান নেই। উবার চালিয়ে কিংবা বাইকে করে পিৎজা বিক্রি করে তাদের দিন কাটছে”। তিনি ব্রাজিলিয়ানদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

এদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট লুলার কারামুক্তি প্রসঙ্গে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জায়ার বোলসোনারো মন্তব্য করেছেন, “তিনি সাময়িকভাবে মুক্তি পেতে পারেন, কিন্তু তিনি দোষীই”।

বাস্তবিকই কারাগার থেকে ছাড়া পেলেও লুলা ডি সিলভাকে দোষী সাব্যস্ত করে দেওয়া আদালতের রায় বহালই থাকছে। ভবিষ্যৎে আর কখনো নির্বাচনও করতে পারবেননা তিনি। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে দূর্নীতির আরও কয়েকটি মামলা এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

ফলে সবক’টি মামলার কাজ পূর্ণাঙ্গভাবে শেষ হয়ে গেলে লুলা ডি সিলভাকে আবারও কারাগারে ফিরে যেতে হবে।

তবে এই মূহুর্তে তার কারামুক্তি ব্রাজিলের বামপন্থী রাজনীতিতে আবারও গতি বাড়াতে সাহায্য করবে আর চাপে ফেলবে বর্তমান প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বাধীন দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকে। কারণ বাম নেতাকর্মী তো বটেই, সাধারণ মানুষের মধ্যেও লুলা ডি সিলভার বেশ প্রভাব রয়েছে।

কেন ছাড়া পেলেন লুলা ডি সিলভা?

ব্রাজিলে তিন বছর আগে একটি বিধান প্রণয়ন করা হয় যাতে বলা হয়, কোন অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর যদি প্রথম আপিলেই হেরে যান তাহলেই তাকে তাৎক্ষণিক কারাগারে পাঠানো হবে।

দূর্নীতিসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত সমাজের ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা যাতে বাইরে অবস্থান করে বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারেন, সে উদ্দ্যেশেই এই ধারা সংযোজন করা হয়েছিল বলে সেসময় দাবি করেছিল সরকার।

কিন্তু আইন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই পরিবর্তনের সমালোচনা করে আসছিল। সবক’টি আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে চূড়ান্তভাবে দোষী হিসেবে গণ্য না করার যুক্তি দেখিয়ে আসছিল তারা।

সম্প্রতি ঠিক সেই মর্মেই এক রুলিং জারি করে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। তিন বছর আগের করা পরিবর্তনটিকে বাতিল ঘোষণা করে দোষী সাব্যস্ত ব্যাক্তির সর্বশেষ আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে প্রেরণ করা যাবেনা বলে আদেশ জারি করে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ আদালত।

এই আদেশের ভিত্তিতেই মুক্তি পেলেন ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা।

একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে সমুদ্রের পাড়ের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ঘুষ হিসেবে নেওয়ার অপরাধে গতবছর লুলা ডি সিলভাকে ১২ বছরের কারাদন্ড দেয় ব্রাজিলের একটি আদালত। পরে অবশ্য শাস্তির মেয়াদ কমিয়ে ৮ বছর ১০ মাস করা হয়।

এবছরের শুরুতে অপর এক মামলায় একাধিক নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুষ হিসেবে ব্যক্তিগত বিভিন্ন ভবনের সংস্কার কাজ করিয়ে নেওয়ার দায়ে আরও ১২ বছর কারাদন্ড দেওয়া হয় সাবেক প্রেসিডেন্ট লুলাকে।