অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বব হক প্রয়াত

(image: SCMP)

অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং দেশটির লেবার পার্টির সাবেক প্রধান বব হক, যিনি ৮০-র দশকে দাপটের সাথে দেশটির রাজনীতিতে বিচরণ করেছেন, ৮৯ বছর বয়সে মারা গেছেন।

ক্যারিশম্যাটিক চরিত্রের অধিকারী এবং বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়া এই নেতা ১৯৮৩ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশটির নেতৃত্ব দেন। অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতির আধুনিকায়নের কান্ডারি ধরা হয় বব হককে।

মধ্য-বামপন্থী দল হিসেবে পরিচিত অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টি থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া নেতাদের মধ্যে হকই সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় ছিলেন।

বব হকের স্ত্রী এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, নিজের বাড়িতে শান্তিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হক।

তিনি যোগ করেন, “আজ আমরা বব হকের মত এক মহান অস্ট্রেলিয়ানকে হারালাম, অনেকের চোখে যিনি যুদ্ধ-পরবর্তী যুগের ‘সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ট্রেলিয়ান’।’’

বব হক ১৯৪৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে লেবার পার্টিতে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে যুক্ত হন এবং ১৯৬৯ সালে ‘অস্ট্রেলিয়ান কাউন্সিল অব ট্রেড ইউনিয়নস’-র প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

তিনি ১৯৮০ সালে প্রথমবার সাংসদ নির্বাচিত হয়ে অস্ট্রেলিয়ার সংসদে প্রবেশ করেন। এর তিন বছরের মাথায় ১৯৮৩ সালে নির্বাচিত হন লেবার পার্টির প্রধানের পদে। একই বছর তার দল অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ নির্বাচনে বিপুল জয় পায়, প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেন বব হক।

হক তার স্বভাবগত তারুণ্যের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। প্রচলিত গুরুগম্ভীর রাজনীতির বিপরীতে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা তার উপস্থিতি অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে তাকে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়।

আবেগপ্রবণ বব হককে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রকাশ্যে কাঁদতে দেখা যেত। এর মধ্যে.১৯৮৯ চীনের তিয়েনানমান স্কয়ারে ছাত্রবিক্ষোভ দমনের ঘটনায় আয়োজিত শোকসভায় তার কান্না আলোচিত হয়েছিল ব্যাপকভাবে।

তবে শুধু ব্যক্তিগত আচরণই নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার কাজও তাকে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে কিংবদন্তীর মর্যাদা এনে দেয়। একের পর এক সামাজিক প্রকল্প গ্রহণ আর দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য তার ভাবনার জন্য সুপরিচিত ছিলেন হক। তার বিখ্যাত এক বক্তব্য ছিল, “আমি এমন দেশ গড়তে চাই যেখানে ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর অস্ট্রেলিয়ান’ বলে কিছু থাকবেনা।’’ যুক্তরাষ্ট্রের আজকের ওবামাকেয়ারের বহু আগেই অস্ট্রেলিয়ায় সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ‘মেডিকেয়ার’ চালু করেছিলেন বব হক।

অর্থনীতিতেও বব হকের অবদান ছিল মনে রাখার মত। অস্ট্রেলিয়ান বাজার ও ব্যবসাকে আরো উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন তিনি। করেছিলেন বহু অর্থনৈতিক সংস্কার।

বব হকের শাসনামলে শিশুদের হাইস্কুল পর্যায়ে পড়াশোনা শেষ করার হার বেড়ে গিয়েছিল ব্যাপক হারে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসন অবসানে তিনি তার বিশেষ ভূমিকা ছিল। অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে খনিজ সম্পদের সন্ধানে হওয়া খননকাজ বন্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছেন হক। তার সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় বর্ণবাদী আচরণ ও বৈষম্য হ্রাস পেয়েছিল উল্লেখযোগ্য হারে।

কিংবদন্তী এই রাজনীতিকের প্রয়াণে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন দেশটির সর্বস্তরের মানুষ।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেভিন রুড টুইটবার্তায় বব হককে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতির মহীরুহ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি স্মরণ করেন মেডিকেয়ার চালু করা, অ্যাপেক প্রতিষ্ঠা, অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতির আন্তর্জাতিকীকরণে বব হকের উদ্যোগের কথা।

আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বব হকের উত্তরসুরী পল কিটিং তার ও হকের যৌথ উদ্যোগে করা উন্নয়ন কার্যক্রমগুলো স্মরণ করেন। নিজেদের সম্পর্ককে ‘সেরা পার্টনারশিপ’ হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।

বব হক এমন এক সময়ে প্রয়াত হলেন যখন আর কয়েকদিনের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার জনগণ দেশটির সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিতে যাবে।