মধ্যপ্রাচ্যে নাশকতার শিকার বিভিন্ন দেশের চার জাহাজ

(image: Reuters)

সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে চারটি বাণিজ্যিক জাহাজ গতকাল এক নজিরবিহীন হামলার শিকার হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে হরমুজ প্রণালীর ঠিক বাইরে ফুজাইরা বন্দরের অদূরে। অবশ্য হামলার কোন মানুষের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে জানিয়েছে আমিরাতের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক দপ্তর।

সৌদি আরব জানিয়েছে, নাশকতার শিকার হওয়া জাহাজ চারটির মধ্যে দুটি জাহাজ তাদের এবং সেগুলো ‘উল্লেখযোগ্য’ ক্ষতির শিকার হয়েছে। অন্য জাহাজ দু’টির মধ্যে একটি নরওয়ের ও অপরটি আরব আমিরাতের।

ঘটনাস্থলের সাথে সমুদ্রসীমা থাকা ইরান ঘটনার পূর্ণ তদন্ত দাবি করেছে।  

ঘটনাটি এমন এক সময় ঘটল, যখন ওই এলাকায় উত্তেজনা হঠাৎ করেই বেড়ে গিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলটি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের এক-পঞ্চমাংশ সংঘটিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উত্তেজনার প্রেক্ষিতে ইরান গত মাসে হুমকি দিয়েছিল তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে যদি ওই সমুদ্র এলাকা তারা ব্যবহার করতে না পারে।

এই হুমকির জবাবে যেসব দেশকে ইরানের সাথে তেল বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছিল, সেই ছাড় তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন প্রশাসন মাত্র ক’দিন আগেই ওই এলাকায় কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে। কারণ হিসেবে তারা বলে, ইরান ওই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য রুটের জন্য সুষ্পষ্ট হুমকি এবং এই হুমকি মোকাবেলার জন্য তারাই সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। জবাবে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে ইরান।

একজন মার্কিন সামরিক কর্তা জানিয়েছেন, চারটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র হামলার তদন্তে সহযোগিতার জন্য অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি টিম সেখানে পাঠিয়েছে।

এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ইউরোপীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে ইরানের বিষয়ে আলোচনার জন্য এক অনির্ধারিত সফরে ব্রাসেলসে গেছেন। 

কী জানা যাচ্ছে হামলাটি সম্পর্কে?

ঘটনাটি সম্মন্ধে খুব সামান্যই জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। তাদের ভাষ্যমতে, রোববার স্থানীয় সময় ভোর ৬টা নাগাদ ওমান উপসাগরে হামলার ঘটনাটি ঘটে। এলাকাটি সংযুক্ত আবর আমিরাতের জলসীমার অন্তর্গত।

আরব আমিরাতের বৈদেশিক সম্পর্ক দফতর জানিয়েছে তারা হামলার তদন্ত শুরু করেছে। একই সাথে কিছু গণমাধ্যম ফুজাইরা বন্দরে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের যে খবর প্রচার করেছে তাকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

সোমবার সকালে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা দেশটির জ্বালানি মন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে নিশ্চিত করে যে আক্রান্ত জাহাজ চারটির মধ্যে তাদের দু’টি তেলবাহী জাহাজ রয়েছে।

“জাহাজ দু’টির মধ্যে একটির রাস তানুরা বন্দর থেকে অপরিশোধিত তেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল”, বলছিলেন সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রী খালিদ-আল-ফালিহ।

সৌদি টেলিভিশনে ‘আমজাদ’ ও ‘আল আরজোকাহ’ নামের তাদের ক্ষতিগ্রস্থ জাহাজ দু’টির ছবি দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে আরব আমিরাত ‘আন্দ্রে ভিকট্রি’ নামের নরওয়ের ক্ষতিগ্রস্থ জাহাজের ছবি প্রকাশ করেছে।

নরওয়ের জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে ফুজাইরা বন্দরে নোঙর করা অবস্থায় তাদের জাহাজটি অজানা কোন বস্তুর দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। তবে জাহাজটিতে থাকা ক্রু’রা নিরাপদে আছেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, নাশকতার শিকার চতুর্থ জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের, যেটির নাম এ. মাইকেল।

উত্তপ্ত উপসাগর

রোববারের ঘটনায় যেই জড়িত থাকুক না কেন, এটি পারস্য উপসাগরের সাম্প্রতিক উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলল নিঃসন্দেহে।

যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি অভিযোগ তুলেছে যে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থের প্রতি ইরান হুমকি হয়ে উঠেছে। যদিও সেটা কিভাবে, দেশটি তা খোলসা করেনি। উলটো নিজেদের অভিযোগে করা কথিত হুমকি মোকাবেলায় সেখানে একটি বিমানবাহী রণতরী এবং কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। একইসাথে কাতারে অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটিতে বি-৫২ বোমারু বিমানের একটি স্কোয়াড্রন মোতায়েন করেছে দেশটি।

এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে ইরান অভিযোগ করে বলেছে, চার জাহাজে হামলার পেছনে ‘তৃতীয় কোন দেশ’-র হাত থাকতে পারে। সুনির্দিষ্টভাবে নাম না করলেও ‘তৃতীয় দেশ’ বলতে তারা ইজরায়েলকে বোঝাতে চেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই অঞ্চলে স্পর্শকাতর তেল ট্যাঙ্কারের ওপর হামলা নতুন ঘটনা হয়। এর আগে আল কায়েদা ইয়েমেনে, সোমালি জলদস্যুরা ওমান উপসাগরে এবং সম্প্রতি হুথি বিদ্রোহীরাও লোহিত সাগরে তেলবাহী জাহাজকে তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে।