চলছে জি-৭ শীর্ষ সন্মেলন : জেনে নিন এই জোটের বিস্তারিত

চলছে জি-৭ শীর্ষ সন্মেলন : জেনে নিন এই জোটের বিস্তারিত
ফ্রান্সের বিয়ারিৎজে চলমান জি-৭ সন্মেলনের একটি বৈঠকে সাত দেশের শীর্ষনেতারা

জি-৭ গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রনেতারা ফ্রান্সের অবকাশযাপন শহর বিয়ারিৎজে মিলিত হয়েছেন সংস্থাটির ৪৫তম শীর্ষ সন্মেলনে যোগ দিতে। কিন্তু জি-৭ আসলে কী, কারা এর সদস্য, আর এর কাজই বা কী?

জি-৭ কী?

‘গ্রুপ অব সেভেন’ বা সংক্ষেপে ‘জি-৭’ হল বিশ্বের শীর্ষ সাতটি শিল্পোন্নত দেশের জোট। এর সদস্যরা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও জাপান।

জি-২০ নামে অনেকটা একই রকম আরেকটি জোট রয়েছে, যা বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ২০ দেশের সমন্বয়ে গঠিত। এই দেশগুলোর মধ্যে শিল্পোন্নত দেশও যেমন রয়েছে, তেমনি খনিজ সম্পদের (তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস) প্রাচুর্যে ধনী হওয়া দেশও আছে।

কিন্তু জি-৭ কেবলমাত্র শিল্পায়নের মাধ্যমে আর্থিক সম্মৃদ্ধির শীর্ষে ওঠা দেশগুলোর জোট। এদের মধ্যে কেবল একটি দেশ এশিয়ার (জাপান), চারটি ইউরোপের (ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি) আর দু’টি আমেরিকা মহাদেশের (যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা)

জি-৭ এর আদর্শ

বৈশ্বিক এই জোটটি নিজেদেরকে ‘নৈতিকতা ভিত্তিক গোষ্ঠী’ হিসেবে বর্ণনা করে থাকে। জোটটির মূলনীতিগুলো হল : স্বাধীনতা ও মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন, সম্মৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন।

জি-৭ এর কর্মপরিধি

১৯৭৫ সালে কানাডা বাদে বর্তমান জোটের বাকি সদস্যরা প্রথমবারের মত মিলিত হয়েছিল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে ওঠার উপায় খুঁজে বের করতে। পরের বছর যোগ দেয় কানাডা।

এর পর থেকেই নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে জি-৭ এর সকল কার্যক্রম। প্রতিবছর একবার করে দু’দিনের জন্য জোটের সদস্য দেশগুলোর সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানরা শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন। আর সারা বছর ধরেই চলতে থাকে মন্ত্রীসহ সরকারগুলোর উচ্চপদস্থ কর্তাদের বৈঠক। সদস্য দেশগুলো প্রতিবছর পালাক্রমে জোটের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকে।

জি-৭ শীর্ষ সন্মেলনে সদস্য দেশগুলো ছাড়াও অন্যান্য বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকেও পর্যবেক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বাৎসরিক শীর্ষ সন্মেলনের শেষ পর্যায়ে যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়। যেসব ইস্যুতে সদস্য দেশগুলো ঐক্যমত্য ও সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, সেগুলোর উল্লেখ থাকে এই ঘোষণাপত্রে। অতীতের জি-৭ শীর্ষ সন্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত এজেন্ডাগুলোর মধ্যে এইচআইভি/এইডস মোকাবেলা, জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাসবাদ দমন, জ্বালানি নীতি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

কতটা কার্যকর এই জোটটি?

অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকলেও বেশকিছু আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সফলতার নজিরও রয়েছে জি-৭ জোটের। অতীতে এইডস, টিবি ও ম্যালেরিয়া রোগের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বৈশ্বিক তহবিল গঠন করেছিল জি-৭। এই তহবিলের কারণে ২০০২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এসব রোগের হাত থেকে আনুমানিক ২৭ মিলিয়ন মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

২০১৬ সালে সম্পাদিত প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে জি-৭। যদিও চুক্তির অন্যতম প্রভাবশালী অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রকে সম্প্রতি এই চুক্তি থেকে বের করে আনার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

চীন কেন জি-৭ এর সদস্য নয়?

বিশ্বের সর্বোচ্চ জনসংখ্যার দেশ চীন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এই দেশটির। আবার চীনের অর্থনৈতিক এই সাফল্য এসেছে শিল্পায়ন ও বাণিজ্যের মাধ্যমে, খনিজ সম্পদের জোরে নয়। তারপরও দেশটি জি-৭ গোষ্ঠীর সদস্য নয়। কিন্তু কেন?

চীনে ধনবৈষম্য বেশ প্রকট। অর্থাৎ দেশটির বিপুল ধনসম্পদ নাগরিকদের মধ্যে সুষমবন্টিত হওয়ার পরিবর্তে কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত। ফলে সমাজের একটি বড় অংশ এখনও দারিদ্রপীড়িত। মূলত এই কারণে সার্বিকভাবে শক্তিশালী অর্থনীতি থাকার পরেও জি-৭ এর সদস্য হতে পারেনি চীন। অবশ্য দেশটি জি-২০ গোষ্ঠীর সদস্য।

রাশিয়াও কেন নেই?

শিল্পোন্নত হওয়ার পরও সোভিয়েত আমলে চীনের মতই মাথাপিছু সম্পদের হিসেবে জি-৭ এ প্রবেশের সুযোগ একটা সময় পর্যন্ত হয়নি রাশিয়ার। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মুক্তবাজার অর্থনীতি গ্রহণ করে দ্রুত সেই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটায় দেশটি। ফলে ১৯৯৮ সালে ইতিহাসের অষ্টম দেশ হিসেবে জি-৭ গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত হয় রশিয়া। জোটের নতুন নামকরণ হয় জি-৮।

কিন্তু ২০১৪ সালে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া অঞ্চল দখল করে নিলে রাশিয়াকে জোট থেকে বহিষ্কার করা হয়। জি-৮ আবার হয়ে যায় জি-৭।

বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য এই জোটে রাশিয়াকে আবার দেখতে চান। তার মতে, বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার টেবিলে রাশিয়ার মত ‘গুরুত্বপূর্ণ’ দেশের থাকাটা জরুরি।

জোটের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো

আদর্শগত দ্বন্দ না থাকলেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য দেখা গিয়েছে জি-৭ জোটে। সেটি স্বাভাবিকও। তবে সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য শুল্ক, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ভিন্নমত প্রকট আকার ধারণ করেছে।

জি-৭ গোষ্ঠীতে জাপান ছাড়া বাকি সব দেশই পশ্চিমা বিশ্বের সদস্য। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং এশিয়ার (জাপান বাদে) কোন প্রতিনিধিত্ব না থাকায় অনেকের চোখেই এই জোটটি ভারসাম্যহীন ও অসম্পূর্ণ।

চীন ও রাশিয়া ছাড়াও, ব্রাজিল, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মত উদীয়মান অর্থনীতির দেশের অনুপস্থিতিও এই জোটের আর্থিক ও বাণিজ্যিক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে রেখেছে। এসব দেশের কোনো কো্নোটির অর্থনীতি ২০৫০ সালের মধ্যে জি-৭ এর বর্তমান বেশ কয়েকটি সদস্যকেও ছাড়িয়ে যাবে বলে এরইমধ্যে আভাস দিয়ে রেখেছেন অর্থনীতিবিদরা।