ট্রাম্পের প্রস্তাবে ডেনমার্কের জবাব, ‘গ্রীনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়’

ট্রাম্পের প্রস্তাবে ডেনমার্কের জবাব, 'গ্রীনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়'
অপূর্ব, একইসাথে খনিজ সম্পদে ভরপুর এবং ভৌগলিকভাবে গুরত্বপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত এই গ্রীনল্যান্ড কিনে নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্টের আগ্রহের জবাবে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের বরফে মোড়া বিশাল দ্বীপ গ্রীনল্যান্ডের পক্ষ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হল ‘গ্রীনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়।’

এর কয়েকদিন আগে ডেনমার্কের অন্তর্গত বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই দ্বীপটি কিনে নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

নিজের উপদেষ্টা ও অতিথিদের সাথে বিভিন্ন সময় আলাপচারিতায় স্বায়ত্তশাসিত এই ডেনিশ দ্বীপটিকে কিনে নেওয়া যায় কিনা এমন প্রস্তাব দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

এর প্রতিক্রিয়ায় গ্রীনল্যান্ডের সরকার বেশ কড়া ভাষায় মন্তব্য করেছে, “গ্রীনল্যান্ড ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত, বিক্রির জন্য নয়।”

দেশটির রাজনীতিবদরা ট্রাম্পের এমন ভাবনার সমালোচনা করেছেন, কেউ আবার হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। গ্রীনল্যান্ডের সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রী টুইট করেছেন, “এটি নিশ্চয়ই এপ্রিল ফুল বানানোর কৌতুক।… তবে সেটিরও মেয়াদ পার হয়ে গেছে।”

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমন প্রস্তাবের খবর প্রথম প্রকাশ করা ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল বলছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘খুব গুরুত্ব’ দিয়েই গ্রীনল্যান্ড কেনার কথা বলছিলেন ওই বৈঠকে।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য গণমাধ্যম অবশ্য বিভক্ত হয়ে পড়েছে এই ইস্যুতে। কোনোটি বলছে, ট্রাম্প নিছকই মজা করছিলেন সেদিন, আবার কোনোটি বলছে, প্রেসিডেন্ট আসলেই যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্রে গ্রীনল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করাতে আগ্রহী।

কেমন ছিল গ্রীনল্যান্ডের প্রতিক্রিয়া?

গ্রীনল্যান্ডের কর্মকর্তারা ট্রাম্পের আগ্রহকে প্রত্যাখান করে জানিয়েছে, তাদের দ্বীপ বাজারের তালিকায় নেই।

দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতি প্রকাশ করেছে গণমাধ্যমে। তাতে বলা হয়, “গ্রীনল্যান্ড মূল্যবান খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। এসবের মধ্যে রয়েছে বিশুদ্ধ জল ও বরফ, মাছ, সি-ফুড, নবায়নযোগ্য জ্বালানি। আরও আছে অ্যাডভেঞ্চার টুরিজ্যমের রোমাঞ্চ। এসব উপাদান নিয়ে গ্রীনল্যান্ড ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত, বিক্রির জন্য নয়।”

একই সুরে আরেক বিবৃতিতে গ্রীনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী কিম কিয়েলসেন বলেন, “গীনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়, কিন্তু গ্রীনল্যান্ড পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে ব্যবসা এবং অন্যান্য সহযোগিতার জন্য উন্মুক্ত, যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও।”

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ডেনমার্কের প্রতিক্রিয়াই বা কেমন ছিল?

স্বায়ত্তশাসিত গ্রীনল্যান্ড যে দেশের অন্তর্গত, ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্খায় স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ সেই ডেনমার্ক।

দেশটির শাসকদল ও বিরোধীদলের সদস্যরা একযোগে ট্রাম্পের প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন। নিন্দা এসেছে গণমাধ্যম সম্পাদক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবি, রাজনীতিবিদসহ সমাজের সকল অংশ থেকে।

এবছরই দায়িত্ব নেওয়া দেশটির প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডারিকসেন অবশ্য এই ইস্যুতে এখনও মুখ খোলেননি। এ সপ্তাহের শেষেই তার গ্রীনল্যান্ড সফর করার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচী রয়েছে।

উল্লেখ্য, যাকে কেন্দ্র করে হঠাৎ এই বিতর্কের সূত্রপাত, সেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজেরও সেপ্টেম্বর মাসে ডেনমার্ক সফর করার কথা রয়েছে। অবশ্য ডেনিশ সরকারের সাথে তার আলোচনার এজেন্ডায় গ্রীনল্যান্ড কেনার কথা থাকবে কিনা তা জানা যায়নি!

ঠিক কোথায় অবস্থিত গ্রীনল্যান্ড?

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ হিসেবে পরিচিত গ্রীনল্যান্ড। অস্ট্রেলিয়ার আয়তন এর চেয়ে বড় হলেও মহাদেশ হওয়ায় সেটিকে দ্বীপ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে গণ্য করা হয়না। গ্রীনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ, তবে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর ও আর্কটিক মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত এই দ্বীপটি।

গোটা দ্বীপটির জনসংখ্যা ৫৬,০০০। এদের সিংহভাগই উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করে। ৯০% নাগরিকই বহু প্রজন্ম ধরে দ্বীপটিতে বাস করছেন। বাকিরা সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এই দ্বীপে এসে বসবাস শুরু করেছেন।

গ্রীনল্যান্ডের ৮০ শতাংশ এলাকাই বরফের চাদরে ঢাকা। তবে বৈশ্বিক উষ্ণতার জেরে এই বরফ দিনকে দিনকে গলে গিয়ে উচ্চতা বাড়াচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের। যা নিয়ে দুশ্চিন্তায় গোটা বিশ্বের পরিবেশ সচেতন মানুষ।

ট্রাম্পের প্রস্তাবে ডেনমার্কের জবাব, 'গ্রীনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়'
প্রতিদ্বন্দী রাশিয়ার খুব কাছে অবস্থিত গ্রীনল্যান্ড হতে পারত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চমৎকার এক সামরিক ঘাঁটি

এত দেশ ছেড়ে গ্রীনল্যান্ডেই কেন নজর পড়ল ট্রাম্পের?

গ্রীনল্যান্ড খনিজ সম্পদের লোভনীয় ভান্ডার। এই দ্বীপে বরফের শত শত ফুট নিচে চাপা পড়ে আছে কয়লা, জিংক, কপার, লোহার আকরিকের মত মূল্যবান সব খনিজ।

এর বাইরেও দ্বীপটি বিশুদ্ধ ও সুপেয় জল, সামুদ্রিক মাছ, অন্যান্য সামুদ্রিক খাবারেরও চমৎকার উৎস। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এমন বিশাল দ্বীপ পেতে কে না চাইবে?

ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকেও দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের আছে আকর্ষণীয়। আমেরিকা মহাদেশ ও ইউরোপ মহাদেশের মাঝামাঝি জায়গায় গ্রীনল্যান্ডের অবস্থান। গত শতকে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে কয়েক দশক ধরে চলা ‘শীতল যুদ্ধ’ এর একেবারে শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বীপে একটি বিমান ও রাডার ঘাঁটি স্থাপন করেছিল। বর্তমানে ইউরোপের আশেপাশে রাশিয়ার নৌবাহিনীর নানামুখী তৎপরতার প্রেক্ষিতে ইউরোপের মূল ভূখন্ডের ঠিক পাশেই অবস্থিত গ্রীনল্যান্ডে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি তৈরি করতে পারলে তা হত রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের বড় এক অর্জন। ফলে সামরিক দিক থেকেও ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রীনল্যান্ডের গুরুত্ব রয়েছে ব্যাপক।

অন্যদেশের ভূখন্ড কি সত্যিই কিনে নেওয়া সম্ভব?

ইতিহাসে বহু নজিরই আছে, যেখানে একটি দেশ আরেকটি দেশের নির্দিষ্ট কোন অংশ পারষ্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে, মূল্য পরিশোধ করে কিনে নিয়েছে।

১৮০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণাধীন লুইজিয়ানা দেশটির কাছে থেকে কিনে নিয়েছিল তৎকালীন মুদ্রায় ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। ১৮৬৭ সালে একইভাবে তারা রাশিয়ার কাছ থেকে ৭.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে কিনে নেয় আলাস্কা।

১৯১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের কাছে থেকে তৎকালীন ‘ডেনিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ’ কিনে নিয়ে এর নামকরণ করে ‘ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডস’।

অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে এভাবে অন্যদেশের ভূখন্ড কেনার নজির সেভাবে নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গ্রীনল্যান্ড কিনতে চাওয়ার যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তা বাস্তব বিবেচনায় অসম্ভব নয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক এবং গ্রীনল্যান্ডের জনগণ একযোগে রাজি থাকে এবং পরিশোধিত মূল্য নিয়ে ঐক্যমতে আসা যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্রে গ্রীনল্যান্ডের ঢুকে পড়ায় আইনগতভাবে কোন বাধা নেই।

যুক্তরাষ্ট্র কি এর আগে গ্রীনল্যান্ড কিনে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল?

অনেকেই ভাবতে পারেন ট্রাম্প ধনকুবের এবং সফল ব্যবসায়ী বলেই হয়ত গ্রীনল্যান্ডের মত একটি দ্বীপ কিনে নেওয়ার কথা তার মাথায় এসেছে। বাস্তবে গ্রীনল্যান্ড কিনে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের ইতিহাস দেড় শতাধিক বছরের পুরনো।

১৮৬৭ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসনের আমলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এক প্রতিবেদনে সুবিধাজনক ভৌগোলিক অবস্থান এবং মূল্যবান সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে গ্রীনল্যান্ড দ্বীপটি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব করে।

এরপর কয়েক দশক পর্যন্ত এব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি আর কোন তৎপরতা চোখে পড়েনি।

দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৪৬ সালে তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান ডেনমার্কের কাছে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে গ্রীনল্যান্ড কিনে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন। এর আগে অর্থমূল্যের বদলে নিজেদের আলাস্কা প্রদেশের কিছু অংশের বিনিময়ে গ্রীনল্যান্ড পাওয়া যায় কিনা, সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান।

তবে লোভনীয় দ্বীপটির মালিকানা ডেনমার্ক সেবারও ছাড়তে রাজি হয়নি, এবারও হবেনা বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিল যুক্তরাষ্ট্রকে।