কোরিও সীমান্তে ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উনের

মাঝখানে সীমানারেখা, দুই দেশের ভূখন্ডে দাঁড়িয়ে দুই রাষ্ট্রনেতার এমন দেখা হওয়া ইতিহাসে বিরল (Image: Reuters)

ঐতিহাসিক এক সফরে প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে উত্তর কোরিয়ায় পা রাখলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এছাড়া তৃতীয়বারের মত বৈঠকও সারলেন দেশটির নেতা কিম জং উনের সাথে।

গত রবিবার দুই কোরিয়ার সীমান্তে অবস্থিত ‘ডি-মিলিটারাইজড জোন’ (ডিএমজেড)-এ দু’নেতার এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এসময় সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইন।

প্রায় এক ঘন্টার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ট্রাম্প ও কিম পরমাণু কর্মসূচী নিয়ে ভেস্তে যাওয়া আলোচনা আবার শুরু করার ব্যাপারে একমত হন।

এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে ভিয়েতনামে অনুষ্ঠিত ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উনের মধ্যকার দ্বিতীয় বৈঠক কোন রকম অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয়। জানা গিয়েছিল, সে বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার নেতাকে আগে পরমাণু কর্মসূচী ত্যাগ করার আহবান জানিয়েছিলেন। কিন্তু কিম জন উন দাবি তোলেন, প্রথমে তার দেশের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিতে হবে। এই নিয়ে মতানৈক্যের জেরেই ভেস্তে যায় ভিয়েতনাম সন্মেলন।

কি কি হল ডি-মিলিটারাইজিড জোনে?

জাপানের ওসাকায় অনুষ্ঠিত জি-২০ শীর্ষ সন্মেলন শেষে দক্ষিণ কোরিয়া সফরে যাওয়ার প্রাক্কালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার এক টুইটে দুই কোরিয়ার সীমান্তে অবস্থিত ডি-মিলিটারাইজড জোনে গিয়ে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সাথে হাত মেলানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এই প্রস্তাবকে ‘আকর্ষণীয়’ হিসেবে উল্লেখ করে এতে কিম জং উনের সন্মতির কথা জানিয়ে দেয় পিয়ংইয়ং। এর পরপরই যুদ্ধাকালীন তৎপরতায় দুই নেতার সাক্ষাৎের আয়োজন শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার প্রশাসন।

রবিবার সকালে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইনের সাথে ‘ডি-মিলিটারাইজড জোন’-র উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দুই প্রেসিডেন্টের ‘ডিএমজেড’ পরিদর্শনের এই কর্মসূচীটি অবশ্য পুর্বনির্ধারিতই ছিল। পরিদর্শন শেষে তারা ডিএমজেড-র ‘জয়েন্ট সিকিউরিটি এরিয়া’-তে আসেন।

দুই কোরিয়ার দীর্ঘ সীমান্তে কেবল একটিই জায়গা আছে যেখানে দু’পক্ষ সামনাসামনি বসে কথা বলতে পারে, উত্তেজনা দেখা দিলে তা নিরসনে আলোচনায় বসতে পারে। পরপর স্থাপিত নীলরঙের কয়েকটি একতলা ঘরের এই স্থানটিরই নাম ‘জয়েন্ট সিকিউরিটি এরিয়া’ (জেএসএ)।

জেএসএ-র ঠিক যেখানটায় উত্তর ও কোরিয়ার সীমান্ত একে অন্যকে স্পর্শ করেছে, সেখানে প্রথমে এসে দাঁড়ান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ওপার থেকে ততক্ষণে একই রেখা বরাবর রওনা হয়েছেন কিম জং উনও। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদজনক রাষ্টনায়ক হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই দুই নেতা মুখোমুখি দাঁড়ান; সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামের পর এই নিয়ে তৃতীয়বার। প্রথমে ট্রাম্প হাসিমুখে কিমকে অভিবাদন জানান, কিমও হেসে শুভেচ্ছা জানান ট্রাম্পকে। এরপর কিম জং উন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আমন্ত্রণ জানান সীমান্তরেখাটি পার হয়ে উত্তর কোরিয়ার মাটিতে পা রাখতে। আমন্ত্রণ রক্ষা করেন ট্রাম্প, সৃষ্টি হয় ইতিহাসের। পদে থাকা অবস্থায় কোন মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রথমবারের মত পা রাখেন উত্তর কোরিয়ার মাটিতে। এর আগে দায়িত্ব ছাড়ার পর দেশটি সফর করেছিলেন সাবেক দুই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ও বিল ক্লিনটন।

এরপর আবার দক্ষিণ কোরিও অংশে ফিরে আসেন ট্রাম্প ও কিম। কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের দিকে এগিয়ে আসেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইন। চেয়ারম্যান কিমের সাথে কুশল বিনিময় করেন তিনি। এরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উনের বৈঠকের জন্য নির্ধারিত ভবন ‘ফ্রিডম হাউজ’-এ প্রবেশ করেন তিন রাষ্ট্রনেতা। আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট কক্ষে বসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও উত্তর কোরিও নেতা কিম।

বলা হয়েছিল, শুধু একটু হ্যান্ডশেক ও সামান্য কিছু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে দুই নেতার ঐতিহাসিক এই সাক্ষাৎ, সব মিলিয়ে বড়জোড় কয়েক মিনিট। কিন্তু ট্রাম্প ও কিম বসে বৈঠকই করলেন প্রায় এক ঘন্টা।

আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন মার্কিন ও উত্তর কোরিও নেতা। কিম জং উন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে তার বৈঠককে তাদের মধ্যকার ‘চমৎকার’ সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে অভিহীত করেন। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প চেয়ারম্যান কিমের সাথে তার বন্ধুত্বকে ‘বিশেষভাবে অসাধারণ’ হিসেবে মন্তব্য করেন। তিনি যোগ করেন, আজকের দিনটি বিশ্বের জন্য ‘দারুণ এক দিন’। দুই কোরিয়াকে বিভক্তকারী রেখাটি পার হতে পারার জন্য নিজের গর্বের কথাও জানান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

কতজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর আগে দেশটিতে গেছেন?

১৯৫৩ সালে কোরিও যুদ্ধ শেষ হবার পর দক্ষিণ কোরিয়ায় ক্ষমতাসীন ও প্রাক্তন মিলিয়ে বেশ কয়েকজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট সফর করলেও, উত্তর কোরিয়াতে সংখ্যাটি মাত্র তিন। তাদের মধ্যে একমাত্র ডোনাল্ড ট্রাম্পই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশটিতে পা রাখলেন। অবশ্য তার এ সফরকে ঠিক ‘সফর’ বলা যায়না, কারণ তা সীমাবদ্ধ ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ড আর কয়েক বর্গফুটের মধ্যে!

এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে ১৯৯৪ সালে জিমি কার্টার ও ২০০৯ সালে বিল ক্লিনটন উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ং সফর করেছিলেন। জিমি কার্টার শুভেচ্ছা সফরে গেলেও, বিল ক্লিনটন গিয়েছিলেন সেখানে আটক কোরিও বংশোদ্ভুত দুই মার্কিন সাংবাদিকের মুক্তির জন্য।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্বসূরী বারাক ওবামা উত্তর কোরিয়ায় না গেলেও প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন দক্ষিণ কোরিয়া সফরের অংশ হিসেবে ডিএমজেড-এ দাঁড়িয়ে উত্তর কোরিয়ার গ্রাম আর সামরিক স্থাপনা দেখে গিয়েছিলেন।

এরপর কি?

সফরটি ছিল ঐতিহাসিক, বৈঠকটিও তাই, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এরপর কি? রগচটা দুই নেতার তিনবার দেখা হওয়া, মাঝেমধ্যে চিঠি পাঠানো, একে অন্যের প্রশংসা করা… এগুলো সৌহার্দ্যের নজির ঠিকই, কিন্তু এসবে কি কোরিও উপদ্বীপে পরমাণু অস্ত্রের ঝুঁকিমুক্ত স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে?

বিশ্লেষকরা বলছেন, সে উত্তর এখনই দেওয়া না গেলেও এটুকু অগ্রগতিও কি পাঁচ-সাত বছর আগে কল্পনা করা গিয়েছিল? শুধু প্রেসিডেন্ট পর্যায়েই বৈঠকে হয়েছে তিনবার, অন্যান্য স্তরে সংখ্যাটি আরও বহুগুণ। ধীরে হলেও পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের শর্তে নিজেদের পরমাণু গবেষণা ত্যাগে আগ্রহ দেখাচ্ছে পিয়ংইয়ং, একসময় এটুকুও কেউ ভাবেনি। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞা আগে প্রত্যাহার করা হবেনা বললেও জানিয়ে রেখেছেন, চলতে থাকা আলোচনায় অগ্রগতি হতে থাকলে তিনি অর্থনৈতিক অবরোধ আংশিক প্রত্যাহারের কথা ভেবে দেখবেন। এটাই বা কম কি?

সুতরাং বৃহত্তর শান্তির স্বার্থে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা ধরে রাখতে পারলে কে বলতে পারে, ‘বিপদজনক’ ট্রাম্প আর কিমের হাত ধরেই হয়ত শান্তি ফিরে আসবে ডিএমজেড-র দুই পাড়ে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উনের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎের মূহুর্তগুলো :

সীমানা রেখার দিকে এগোচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প (Image: Reuters)
সীমানা রেখা মাঝখানে রেখে দু’দেশের ভূখন্ডে দাঁড়িয়েই দেখা হল ট্রাম্প ও কিমের, মেলালেন হাত (Image: Reuters)
কিমের অনুরোধে সীমানা রেখা পেরিয়ে উত্তর কোরিয়ায় পা রাখছেন ট্রাম্প (Image: Reuters)
উত্তর কোরিয়ার মাটিতে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প ও কিমের আরেক দফা করমর্দন, ছবি নিতে ব্যস্ত সাংবাদিকরা (Image: Reuters)
এবার ফেরার পালা (Image: Reuters)
কাকতালীয়!.. সীমানা রেখায় পা দুই নেতার। ফলে ঠিক ওই মূহুর্তে কোন দেশেই দাঁড়িয়ে ছিলেননা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উন! (Image: Reuters)
উত্তর থেকে ফিরে দক্ষিণ কোরিও অংশে দুই নেতার আবার করমর্দন (Image: Reuters)
সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে কথা বললেন কিম জং উন (Image: Reuters)
তিন প্রেসিডেন্ট : উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন, যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প ও দক্ষিণ কোরিয়ার মুন জায়ে-ইন (Image: Reuters)
এরপর একান্ত বৈঠকে বসলেন কিম জং উন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প (Image: Reuters)
একান্ত বৈঠকে আরও একবার হাত মেলালেন কিম ও ট্রাম্প (Image: Reuters)
কিমের সাথে সাক্ষাৎের কিছুক্ষণ আগে ডিএমজেড থেকে সীমানার ওপার পর্যবেক্ষণে মার্কিন ও দক্ষিণ কোরিও প্রেসিডেন্ট (Image: Reuters)
ডিএমজেড থেকে সীমানার ওপার পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মুন জায়ে-ইন (Image: Reuters)