আবার উত্তপ্ত হংকং, বিক্ষোভকারীদের পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস

(Image: Reuters)

মাঝখানে কয়েকটা দিন শান্ত থাকার পর আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে হংকংয়ের পরিস্থিতি। গত দু’দিন ধরে পুলিশের সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলছে সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীদের।

চীনা সরকারের একটি কার্যালয়ে বিক্ষোভকারীরা প্রবেশ করতে চাইলে পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে।

ছোট্ট নগররাষ্ট্রটিতে গণতন্ত্রপন্থী ও সরকারবিরোধী ব্যাপক গণআন্দোলন এই নিয়ে আট সপ্তাহে পা দিল। সিংহভাগ সময়েই শান্তিপূর্ণভাবে চললেও সাম্প্রতিক সময়ে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা দেখা যাচ্ছে।

পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ শহরগুলোর অন্যতম হিসেবে পরিচিত হংকংয়ে পুলিশ, বিক্ষোভকারী আর মুখোশ পড়া সন্দেহভাজন দুষ্কৃতীকারীদের ত্রিমুখী সংঘর্ষে এখন অস্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করছে।

পুলিশের টিয়ার শেল আর রাবার বুলেটের আক্রমণের মোকাবেলায় রবিবার আন্দোলনকারীদের হেলমেট, গ্যাস মাস্ক আর চোখে গগলস পড়ে বিক্ষোভে অংশ নিতে দেখা যায়। তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে ‘হংকংকে মুক্ত কর’ স্লোগান দিতে থাকে।

পুলিশের পক্ষ থেকে শহরের কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকার একটি পার্কে বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য আন্দোলনকারীদের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। বিক্ষোভকারীরা কিছু সময় সেখানে অবস্থান করলেও এক পর্যায়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পূর্বদিকে কজওয়ে বে অঞ্চলের বাজার এলাকা এবং পশ্চিমদিকে সাই ওয়ান এলাকায় অবস্থিত চীনা লিঁয়াজো অফিসের দিকে যাত্রা শুরু করে।

নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকশ সদস্য তখন চীনের লিঁয়াজো কার্যালয় সংলগ্ন পুরো এলাকা ঘিরে রাখে। উল্লেখ্য গত রবিবার বিক্ষোভকারীরা এই কার্যালয়ের দেয়ালে গ্রাফিটি এঁকে ও কালি লাগিয়ে গিয়েছিল। এর পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এদিন আগেভাগেই প্রস্তুত ছিল হংকং পুলিশ। তারা প্লাস্টিকের ব্যারিকেড দিয়ে ভবনটি ঘিরে দেয়। এমনকি ওপরের দিকে টাঙানো চীনের রাষ্ট্রীয় সিলটিও স্বচ্ছ প্লাস্টিকের আবরণ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।

গত রবিবারের গাফিতি ও কালি লাগানোর ঘটনার পর চীনের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছিল, চীন সরকারের প্রতি এমন চ্যালেঞ্জ তারা সহ্য করবেনা।

এদিনের বিক্ষোভের সময় আন্দোলনকারীরা ‘হংকং ফিরিয়ে দাও’ ও ‘এটা আমাদের সময়ের বিপ্লব’ শ্লোগান দিয়ে চিৎকার করতে থাকে। শ্লোগান লেখা বিভিন্ন ব্যানারও বহন করছিল কয়েকজন।

এদের একটি অংশ ব্যারিকেডের দিকে এগোতে গেলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। এতে কয়েকজন আন্দোলনকারী সামান্য আহত হন।

অন্যদিকে কজওয়ে বে’র বাজার এলাকায় পরিস্থিতি ছিল শান্ত। সেখানে আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভ করতে যেমন দেখা যায়, তেমনি ঘুরতে আসা পর্যটকদের শপিং ব্যাগ হাতে নিয়ে স্বচ্ছন্দে কেনাকাটা করতেও দেখা যায়।

কিভাবে শুরু হল বর্তমান অচলাবস্থা?

গত ৩ এপ্রিল হংকংয়ের সরকার দেশটির বিদ্যমান বহিঃসমর্পণ আইনে কিছু পরিবর্তন আনার ঘোষণা দেয়। এতে হংকংয়ের কোন অভিযুক্তকে প্রয়োজনে দেশের বাইরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়।

এই ঘোষণার পরপরই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে হংকংয়ের সাধারণ মানুষ। তাদের মতে সরকারবিরোধী এবং চীনবিরোধী ভিন্নমত দমন করার উদ্দেশ্যেই বহিঃসমর্পণ আইনে এমন সংশোধন আনতে চাইছে সরকার।

প্রস্তাবিত এই আইনের প্রতিবাদে তখন থেকেই রাজপথে নেমে নিয়মিতভাবে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে দেশটির সাধারণ মানুষ, যা এখন পা দিয়েছে অষ্টম সপ্তাহে।

শুরু থেকে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও গত রবিবার একটি মেট্রো স্টেশনে আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিসোটা নিয়ে চড়াও হয় মুখোশধারী একদল লোক। তাদের আক্রমণে আহত হয় বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী, ট্রেনযাত্রী ও সাংবাদিক। তারা অভিযোগ করে, পুলিশই শহরের একদল গুন্ডাকে মুখোশ পরিয়ে, সশস্ত্র করে তাদের ওপর হামলা চালাতে পাঠিয়েছে। পুলিশ অস্বীকার করেছে এমন অভিযোগ।

এর কয়েকদিন আগে দিনকে দিন বিক্ষোভের মাত্রা বাড়তে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে হংকংয়ের চীনপন্থী প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যাম প্রস্তাবিত বহিঃসমর্পণ বিলটি স্থগিতের ঘোষণা দেন। তাতে সাময়িক স্বস্তি প্রকাশ করলেও রাজপথ ছাড়েনি আন্দোলনকারী। তাদের দাবি, স্থগিত নয়, পুরোপুরি বাতিল করতে হবে বিলটি। এছাড়া আরও কিছু নতুন দাবিও তারা সংযুক্ত করেছে চলমান আন্দোলনে।

উল্লেখ্য, হংকংয়ের বর্তমান শাসক ক্যারি ল্যাম জনগণের ভোটে নির্বাচিত হননি, তিনি চীন সরকারের মনোনয়নের ভিত্তিতে এই পদে বসেছিলেন। বিক্ষোভকারীরা এখন দাবি তুলছেন, ক্যারি ল্যামকে পদত্যাগ করতে হবে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে হংকংবাসীকে নিজেদের নেতা নিজেদেরই বেছে নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এছাড়াও গত আট সপ্তাহের আন্দোলনে বিভিন্ন সময় পুলিশ ও দুস্কৃতীদের হামলার ঘটনার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।