ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে পুনঃনির্বাচিত হলেন জোকো উইদোদো

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে পুনঃনির্বাচিত হলেন জোকো উইদোদো
(image: Reuters)

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে পুনরায় নির্বাচিত হলেন ২০১৪ সালে থেকে ক্ষমতায় থাকা জোকো উইদোদো। গত মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সেনাবাহিনীর সাবেক জেনারেল প্রবোয়ো সুবিয়ানতোকে হারিয়ে আরও পাঁচ বছরের জন্য ইন্দোনেশিয়ার মসনদে বসলেন ৫৭ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ।

ইন্দোনেশিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্পূর্ণ ফলাফল ঘোষণা করা হয় ভোট গ্রহণের কয়েক সপ্তাহ পর। সম্পূর্ণ এবং নির্ভূল ফলাফল পাওয়াই এমন ব্যবস্থার উদ্দেশ্য। সেইমত গত মাসে হয়ে যাওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল ঘোষণার তারিখ ২২ মে নির্ধারণ করে দেশটির নির্বাচন কমিশন। তবে প্রতিদ্বন্দী দলগুলোর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কায় একদিন আগেই ফল ঘোষণা করে দেয়া হয়।

যেকোন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে দেশটির রাজধানী জাকার্তা জুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় ৩২,০০০ সদস্য মোতায়েন করা হয়।

এদিকে নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট উইদোদোর প্রতিদ্বন্দী প্রার্থী জেনারেল প্রবোয়ো ঘোষিত ফলাফল মেনে নিয়েছেন কিনা তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যাওনি। ফলাফলে আপত্তি থাকলে দেশটির আদালতে আপিল করার সুযোগ রয়েছে ৬৭ বয়সী এই প্রাক্তন সেনা অফিসারের।

অবশ্য ভোটগ্রহণের পর অনানুষ্ঠিক ফলাফলে প্রেসিডেন্ট উইদোদোর এগিয়ে থাকার খবর পাওয়ার পর থেকেই জেনারেল প্রবোয়ো নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুলছেন এবং প্রতিবাদে রাজপথে বড়সড় বিক্ষোভের হুমকি দিয়ে আসছেন।

এখানে উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও মুখোমুখি হয়েছিলেন জোকো উইদোদো ও জেনারেল প্রবোয়ো। দু’জনেই সেবার প্রথমবারের মত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দীতা করেছিলেন। নির্বাচনে জোকো উইদোদো জয়লাভ করলে এর বিরুদ্ধে আদালতে আপিল করেন প্রবোয়ো। তবে শেষ পর্যন্ত খারিজ হয়ে যায় তার আপিল।

সেবারের তিক্ততার রেশ এসে পৌঁছায় এবারের নির্বাচনেও। প্রচারণায় একে অপরকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন প্রেসিডেন্ট উইদোদো ও জেনারেল প্রবোয়ো। এবারের নির্বাচনের চোখে পড়ার মত বিষয় ছিল ধর্মের ব্যবহার। শুরু থেকেই দেশের কট্টর ইসলামপন্থীদের সমর্থন পাওয়ার জন্য তৎপর ছিলেন জেনারেল প্রবোয়ো। অন্যদিকে চরমপন্থার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট উইদোদোর প্রচারণায় ছিল সম্প্রীতির সুর।

দেশি-বিদেশি স্বাধীন পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায় ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো পেয়েছেন মোট ভোটের ৫৫.৫ শতাংশ। আর তার প্রতিদ্বন্দী প্রবোয়ো সুবিয়ানতোর প্রাপ্ত ভোট ৪৪.৫ শতাংশ। দেশটির ১৯২ মিলিয়ন বৈধ ভোটার গত ১৭ এপ্রিল ভোটকেন্দ্রে যান প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি জাতীয় ও স্থানীয় মিলিয়ে প্রায় ২০,০০০ জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য। কয়েক দফায় অনুষ্ঠিত ভারতের সাধারণ নির্বাচন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত হলেও, এক দফায় সম্পন্ন হওয়া নির্বাচনগুলোর মধ্যে বৃহত্তমের স্বীকৃতি পেয়েছে ইন্দোনেশিয়ার এবারের নির্বাচন।

পরিস্থিতি কেমন বিরাজ করছে দেশটিতে?

নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সবাইকে শান্ত থাকার আহবান জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। দেশের বিভভন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় গিয়ে দেখা গেল নিরাপত্তা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন রয়েছে। সাথে রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া ও জলকামানও।

দেশটির পুলিশ গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন আইএস-র সাথে সম্পর্কিত কয়েকজন সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারের দাবি করেছে, যারা কিনা নির্বাচনের ফল ঘোষণার সময় রাজনৈতিক সমাবেশগুলোতে বোমা হামলার পরিকল্পনা করছিল।

একই দিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক ভ্রমণ সতর্কবার্তায় তার দেশের নাগরিকদের ইন্দোনেশিয়ার যেকোন রাজনৈতিক জমায়েত ও বিক্ষোভ কর্মসূচী এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

এবারের নির্বাচনের ইস্যুগুলো

প্রধান না হলেও, ধর্ম ছিল এবারের নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম আলোচিত বিষয়। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়ায় আনুষ্ঠানিক কোন রাষ্ট্রধর্ম নেই। দেশটির ৮০ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। অন্যান্য ধর্মের বাকি ২০ ভাগ মানুষের সব ধরনের অধিকার দেশটির সংবিধানে নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পরমতসহিষ্ণুতা্র সুনাম থাকলেও, ইন্দোনেশিয়ার কোন কোন প্রদেশে কট্টর শরিয়া আইনের প্রয়োগ এবং মাঝেমধ্যে মাথাচাড়া দেওয়া জঙ্গিবাদ নিয়ে উদ্বিগ্ন দেশটির নাগরিকদের একাংশ।

২০১৬ সালে রাজধানী জাকার্তার চীনা বংশোদ্ভূত খ্রিস্টান গর্ভনর বাসুকি যাহাযা পূর্নামার বিরুদ্ধে দেশটির কট্টরপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো ইসলাম অবমাননার অভিযোগ আনে। কয়েকদিন ধরে রাজপথে তাদের চালানো বিক্ষোভের মুখে বাসুকিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বিচারে দু’বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। গ্রামাঞ্চলে এদের প্রভাবও লক্ষণীয় ভাবে বেড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, মূলত এই কারণেই জেনারেল প্রবোয়ওতো বটেই, প্রেসিডেন্ট উইদোদোও এবারের নির্বাচনের প্রচারণায় ইসলামকে বাড়তি গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়েছেন। উইদোদো নিজের ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে বেছে নেন প্রভাবশালী মুসলিম নেতা মারুফ আমিনকে। অন্যদিকে জেনারেল প্রবোয়ো ঘোষণা দেন নির্বাচিত হলে ধর্মীয় নেতাদের যেকোন আঘাত থেকে রক্ষা করার এবং সারা দেশের ইসলামিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বরাদ্দ বৃদ্ধির।

কে এই জোকো উইদোদো?

২০১৪ সাল থেকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে রয়েছেন ৫৭ বছর বয়সী জোকো উইদোদো। সেবারই প্রথম প্রসিডেন্ট পদে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন উইদোদো এবং প্রথমবারেই সফল। উল্লেখ্য সেবারও তার প্রতিদ্বন্দী ছিলেন জেনারেল প্রবোয়োই।

খুব সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা জোক প্রথমবার বহিঃর্বিশ্বে পরিচিতি পান ২০১২ সাল দেশটির রাজধানী জাকার্তার গভর্নর নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে।

তার আমলে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিতে গতি আসে এবং মেয়াদের পুরো সময়েই তিনি তা ধরে রাখতে পেরেছিলেন। দেশটির শীর্ষ পদে পৌঁছেও নিজের সাধারণ জীবনযাপন, নাগরিকদের সাথে মিশতে পারার ক্ষমতা তাকে যথেষ্ঠ জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে।

তবে ২০১৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় উইদোদো মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছলেন, তা তিনি ক্ষমতায় এসে রক্ষা করতে পারেননি বলে তার অনেক সমর্থকেরও ধারণা। এছাড়া তার আমলে ইন্দোনেশিয়ার অবকাঠামো খাতে চীনেকে ব্যাপক বিনিয়োগ করতে দেওয়াকেও সন্দেহের চোখে দেখেন অনেকেই।

জোকো উইদোদোর ‘সাধারণ মানুষ’ ভাবমূর্তির বিপরীতে জেনারেল প্রবোয়ো পরিচিত দেশটির অভিজাত রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের সাথে তার ওঠাবসার জন্য। প্রবোয়ো ছিলেন ৩০ বছর কঠোর হাতে দেশ শাসন করা ইন্দোনেশিয়ার সাবেক সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল সুহার্তোর জামাতা।

সুহার্তোর শাসনামলে প্রবোয়ো নিজেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ থাকলেও বরাবরই তা অস্বীকার করে এসেছেন তিনি।

নির্বাচনী প্রচারণায় জেনারেল প্রবোয়ো প্রতিশ্রুতি দেন, ক্ষমতায় এলে উইদোদোর আমলে হওয়া প্রতিটি চীনা বিনিয়োগ পুনরায় পর্যালোচনা করাবেন তিনি।