ইরানে আবিষ্কৃত হয়েছে তেলের বিশাল ভান্ডার : প্রেসিডেন্ট রুহানি

ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি (Image: Reuters)

ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি চমক জাগানো এক ঘোষণায় জানিয়েছেন, তার দেশে প্রাকৃতিক তেলের বিপুল এক ভান্ডারের সন্ধান পাওয়া গেছে। আলোড়ন তোলা এই ঘোষণায় প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেছেন, সন্ধান পাওয়া তেলের পরিমান ইরানের বর্তমান মজুদের এক-তৃতীয়াংশের সমপরিমান।

ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুজেস্থান প্রদেশে ২৪০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই খনির তলদেশে ৫৩ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে বলে জানান রুহানি।

প্রাকৃতিকভাবে তেলসম্পদে সমৃদ্ধ হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের নানামুখী নিষেধাজ্ঞার জেরে তা কয়েক বছর ধরেই ঠিকমত কাজে লাগাতে পারছেনা ইরান।

বিশেষ করে পরমাণু কর্মসূচী নিয়ে ২০১৫ সালে ইরানের সাথে সম্পাদিত পশ্চিমা বিশ্বের চুক্তি থেকে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে তেল বিক্রি নিয়ে ব্যাপক সংকটে রয়েছে দেশটি। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে ইরা্নের তেলের অনেক ক্রেতা দেশই অন্যান্য রাষ্ট্র থেকে তেল কিনতে শুরু করায় ধাক্কা খায় ইরানের অর্থনীতি।

এমন অবস্থায়ই তেলের এই বিশাল ভান্ডারের খবর সামনে এল। ইরানের ইয়াজাদ শহরে এক অনুষ্ঠানে নতুন এই আবিষ্কারের বিস্তারিত তুলে ধরে প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেন, “আমরা এমন একটি তেলক্ষেত্রের সন্ধান পেয়েছি যেখানে ৫৩ বিলিয়ন ব্যারেলের সমপরিমান তেল সঞ্চিত রয়েছে। বিশাল এই খনিটি বোস্তান শহর থেকে শুরু করে ওমিদিয়ে শহর পর্যন্ত ২৪০০ বর্গ কিলোমটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। খনিটিতে তেলের স্তরের গভীরতা ৮০ মিটার (২৬২ ফুট)”।

প্রেসিডেন্ট রুহানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে মন্তব্য করেন, “আমি হোয়াইট হাউজকে বলছি, আপনারা যখন ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে যাচ্ছিলেন, সেসময় আমাদের কর্মী ও প্রকৌশলীরা আরও ৫৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল খুঁজে বের করেছে”।

নতুন আবিষ্কৃত এই খনিটি হতে চলেছে ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেলক্ষেত্র। দেশটির আহভাজ প্রদেশে অবস্থিত বৃহত্তম খনিতে এর চেয়েও বেশি প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুদ রয়েছে।

বিপুল পরিমান তেলের একাধিক ভান্ডারের সুবাদে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা স্বত্তেও ইরান এখনও বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারকদের অন্যতম। প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের তেল রপ্তানি করে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি।

তবে শুধু তেলই নয়, প্রাকৃতিক গ্যাসেরও সম্মৃদ্ধ ভান্ডার রয়েছে দেশটিতে। তেলের মজুদে ইরানের অবস্থান বিশ্বে যেখানে চতুর্থ, সেখানে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদে তা দ্বিতীয়। আবার শুধু ভূপৃষ্ঠেই নয়, পারস্য উপসাগরের তলায়ও প্রতিবেশি কাতারের সাথে যৌথভাবে বিপুল পরিমান তেলের মালিক ইরান।

প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক সম্ভাবনাময় ইরানের স্বাভাবিকভাবেই রয়েছে সামরিক উচ্চাকাঙ্খাও। বহুদিন ধরেই নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রের স্বপ্ন দেখে আসছে দেশটি।

আর এতেই বরাবর উদ্বিগ্ন পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো, এমনকি ইরানের অনেক মিত্রদেশও। ইরানের পরমাণু কর্মসূচী যাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বেসামরিক ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ থাকে, সেজন্য কখনো আলোচনা মাধ্যমে, কখনো অর্থনৈতিক অবরোধের শাস্তি দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে এসেছে তারা।

ক্রমাগত নিষেধাজ্ঞায় জেরবার ইরানও একসময় অবরোধ তুলে নেওয়ার শর্তে পরমাণু কর্মসূচীতে নিয়ন্ত্রণ আনার আগ্রহ দেখালে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে ইরানের ঐতিহাসিক এক চুক্তি হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নেতৃত্বাধীন  যুক্তরাষ্ট্রও সামিল ছিল সেই চুক্তিতে।

কিন্তু ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হওয়ার পর থেকেই চুক্তিটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। অবশেষে গত বছর চুক্তিটি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্র। একই সাথে ইরানের ওপর চাপাতে থাকে একের পর এক কঠোর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের রোষানলে পড়ার ভয়ে ইরানের অনেক সহযোগী দেশও তাদের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সীমিত করে ফেলে।

এসবের ধাক্কায় গত কয়েক বছর ধরেই বিপর্যস্ত ইরানের অর্থনীতি। মুদ্রার মান ক্রমশ নিম্নমুখী, বাড়ছে মুদ্রাস্ফীতি, হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে একের পর এক বিদেশি বিনিয়োগ। আবার এসবের জেরে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভের ঘটনায় বাড়ছে রাজনৈতিক অস্থিরতাও।

এখন দেখার বিষয়, নতুন আবিষ্কৃত বিশাল এই তেলক্ষেত্র দেশটির অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে কিনা।