মাহিন্দ্রা রাজাপাকসেকে প্রধানমন্ত্রী করলেন গোতাভায়া রাজাপাকসে

শপথ গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দ্রা রাজাপাকসে ও প্রেসিডেন্ট গোতাভায়া রাজাপাকসে (Image: Reuters, Dinuka Liyanawatte)

শ্রীলংকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট গোতাভায়া রাজাপাকসে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন তারই সহোদর সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ্রা রাজাপাকসেকে। এর মাধ্যমে ১০ বছর আগে প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে যে দুই ভাইয়ের হাতে দেশটির দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অবসান হয়েছিল, তাদের কাছেই আবার ফিরে এল শ্রীলংকার শাসনভার, আরও পাকাপোক্ত হয়ে।

নিয়োগের পরপরই রাজধানী কলম্বোতে অনাড়ম্বর এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন মাহিন্দ্রা রাজাপাকসে। এর আগে গত রবিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট পদে বসেন মাহিন্দ্রার ভাই সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী গোতাভায়া রাজাপাকসে।

কয়েকদিনের ব্যবধানে দেশের শীর্ষ দুই পদে রাজাপাকসে ভাইদের এই অধিষ্ঠানে উদ্বিগ্ন শ্রীলংকার মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো। ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মাহিন্দ্রা রাজাপাকসে প্রেসিডেন্ট ও গোতাভায়া রাজাপাকসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন সংখ্যালঘু তামিল সম্প্রদায় ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর ব্যাপক দমনপীড়নের অভিযোগে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচিত হন তারা দু’জনেই।

রাজাপাকসে ভাইয়েরা তাদের বিরুদ্ধে আনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সেসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছেন।

রবিবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র সাত মাস আগে এপ্রিলে ইস্টার সানডের দিনে দেশটির একাধিক গীর্জা ও হোটেলে একযোগে বোমা হামলা চালিয়েছিল উগ্রপন্থী সংগঠন আইএস। দেশি-বিদেশি নাগরিক মিলিয়ে প্রায় আড়াই শতাধিক লোক নিহত হন সেদিনের হামলায়।

ঐ ঘটনার প্রেক্ষিতে রবিবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বাকি সব বিষয়কে পেছনে ফেলে মূল ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় জাতীয় নিরাপত্তা।

আর এটাই নির্বাচনের ফলাফল অনুকূলে আনতে গোতাভায়া রাজাপাকসেকে সাহায্য করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ নিরাপত্তা ইস্যুতে তার অবস্থান বরাবরই কঠোর।

দীর্ঘ তামিল বিদ্রোহ দমনে রাজাপাকসেদের ভূমিকা

শ্রীলংকা জাতিগতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ সিংহলি ও সংখ্যালঘু হিন্দু তামিল সম্প্রদায়ে বিভক্ত। স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে আশির দশকে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে তামিলদের একটি অংশ। ক্রমে তা রূপ নেয় ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে।

তিন দশক ধরে চলা সেই গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারান প্রায় এক লক্ষ মানুষ। সরকার ও বিদ্রোহী উভয় তরফেই ব্যাপক আকারে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটে গৃহযুদ্ধের পুরোটা সময় জুড়েই।

২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েই গৃহযুদ্ধ অবসানে তামিল বিদ্রোহীদের ওপর সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরু করেন মাহিন্দ্রা রাজাপাকসে। সাফল্যও পান তিনি। সামরিক অভিযানে তামিল বিদ্রোহীদের কার্যত নির্মূল করে ২০০৯ সালে তিন দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধ জয়ের ঘোষণা দেন রাজাপাকসে।

এই সামরিক অভিযানের সাফল্যের অনেকখানি কৃতিত্ব মাহিন্দ্রার ভাই গোতাভায়াকেও দেওয়া হয়। কারণ তিনি ছিলেন সেসময়ের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ছিল তারই হাতে।

তবে অভিযানের একেবারে শেষের দিনগুলোতে তামিলদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘনের ব্যাপক অভিযোগ ওঠে শ্রীলংকার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে। বিদ্রোহীদের সাথে সাথে বহু বেসামরিক তামিল নাগরিকও সেসময় নিহত বা নিখোঁজ হন।

অনেক ঘটনাতেই আটকের পর সামরিক বাহিনীর হেফাজতে থাকা অবস্থায় তামিল বিদ্রোহীদের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এমনকি সাদা পতাকা দেখিয়ে আত্মসমর্পণ করতে আসা বিদ্রোহীদেরও গুলি করে হত্যার অভিযোগ ওঠে বাহিনীর বিরুদ্ধে।

তবে শুধু তামিল বিদ্রোহীরাই নয়, রাজাপাকসেদের বিরুদ্ধাচারণ করা অনেক ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীও সেসময় নিখোঁজ হয়েছিলেন, যাদের অনেকেরই কোনও খবর আজও পাওয়া যায়নি।

ভূক্তভোগী তামিল ও অন্যান্যদের স্বজনেরা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে।

অন্যদিকে মাহিন্দ্রা রাজাপাকসে ও গোতাভায়া রাজাপাকসে উভয়েই তাদের সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগগুলো শুরু থেকেই ক্রমাগত অস্বীকার করে এসেছেন।