ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা, এবার লক্ষ্য সরাসরি খামেনি

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি (Image: Reuters)

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ইরানের ওপর আরেক দফা ‘কড়া’ নিষেধাজ্ঞা জারি করতে যাচ্ছেন। তিনি জানিয়েছেন, এবারের নিষেধাজ্ঞার আওতার মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির কার্যালয়ও পড়তে যাচ্ছে। বাস্তবিকই তেমনটা হলে তা হতে যাচ্ছে বিরল এক ঘটনা।

ট্রাম্প মন্তব্য করেন, মার্কিন ড্রোন গুলি করে নামানো এবং ‘অন্যান্য আরও কারণে’ ইরানের বিরুদ্ধে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে। তার দাবি, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকেও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে কারণ ঐ অঞ্চলের অস্থিরতার জন্য আয়তুল্লাহ খামেনিই দায়ী।

প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ একে ‘মার্কিনিদের ঘৃণ্য কূটনীতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি আরও মন্তব্য করেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘যুদ্ধের তৃষ্ণা’ পেয়ে বসেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করাকে নতুন নিষেধাজ্ঞার অন্যতম কারন হিসেবে বর্ণনা করলেও মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্টিভ ম্নুচিন জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে ড্রোন নামানোর ঘটনার আগেই সর্বশেষ এই নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত নেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতারেস সব পক্ষকে শান্ত থেকে কূটনৈতিকভাবে সংকট মোকাবেলার আহবান জানিয়েছেন।কারা পড়বে নিষেধাজ্ঞার আওতায়?মার্কিন অর্থ দপ্তর জানিয়েছে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর অন্যতম প্রধান শাখা ‘ইসলামিক রেভ্যুলিউশন গার্ড কর্পস’ (আই.আর.জি.সি.)-র শীর্ষ ৮ কমান্ডার এই নিষেধাজ্ঞার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এই ৮ সেনা অফিসার পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিরতা ও সহিংসতা সৃষ্টির কাজ করে যাচ্ছে।

আরও জানানো হয়েছে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের যেকোন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক লেনদেন আটকে দেওয়া হবে এই নিষেধাজ্ঞার আওতায়। একইসাথে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির কার্যালয় যেসব কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছে বা দেবে, তিনি সরকারি সংস্থার হোক বা বেসরকারি, ইরানের অভ্যন্তরীণ পদের হোক বা আন্তর্জাতিক, তাদের বিরুদ্ধেও আর্থিক অবরোধ সৃষ্টি করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে ট্রাম্পের নতুন এই আদেশনামায়।

অর্থমন্ত্রী ম্নুচিন বলেন, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফের বিরুদ্ধেও এসপ্তাহের শেষে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হবে।খামেনির ওপর চাপ প্রয়োগসরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি ও তার কার্যালয়ের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার জারি করাটা যথেষ্ঠ তাৎপর্যপূর্ণ। খামেনি শুধু প্রধান ধর্মীয় নেতাই নয়, রাজনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইরানে তার কথাই শেষ কথা। দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের সর্বময় ক্ষমতাও তারই হাতে।

খামেনি ‘সেতাদ’ নামে একটি অভ্যন্তরীণ সংস্থার তত্ত্বাবধান করেন, যেটি ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের পর বিপ্লব-বিরোধী আখ্যা পাওয়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করত এবং পরবর্তীতে তা দিয়ে একটি তহবিল গঠন করেছিল যার সার্বিক মূল্য প্রায় ৯৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

‘সেতাদ’-র বিরুদ্ধে বহু আগেই নিষেধাজ্ঞা জারি করা আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। আর এবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও গভীরে গিয়ে হাত দিলেন আয়াতুল্লাহ খামেনির একেবারে ডেরায়। তার অতি অনুগত হিসেবে যাদেরকেই মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী মনে করা হবে, তাদেরকেই পড়তে হবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কোপের মুখে।

সুতরাং এর অর্থ দাড়াচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা জাতিসংঘের জারি করা একের পর এক আর্থিক, বাণিজ্যিক বা তেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত ইরানের হাত-পা আরও বেঁধে ফেলার উদ্যোগ নিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন, যাতে করে নিরুপায় হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয় দেশটি।

মার্কিন সরকারের মূল দাবি হল ইরান তার পরমাণু কর্মসূচী বাতিল করুক, মিসাইল পরীক্ষা বন্ধ করুক এবং আরব অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের বিদ্রোহীদের কথিত মদত দেওয়া থেকে বিরত থাকুক।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও দাবি করেছেন, ইরানের ওপর আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার কারণেই দেশটি এখন আর আগের মত প্রতিবেশী দেশগুলোতে জঙ্গি তৎপরতায় অর্থায়ন করতে পারছেনা।আগের নিষেধাজ্ঞাগুলোর কি প্রভাব পড়েছে ইরানের ওপর?এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর যেসব আর্থিক অবরোধ জারি করেছিল, সেগুলোর প্রভাবে দেশটির অর্থনীতি বহুলাংশে দূর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি, সমুদ্র পরিবহন এবং আর্থিক খাতে নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে দেশটির আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। যার প্রভাবে ইরানের অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের সংকট সৃষ্টি হয়েছে, যাওবা পাওয়া যাচ্ছে তার দামও হয়ে পড়ছে আকাশছোঁয়া।

দেশটির মুদ্রা রিয়েলের মানও গত কয়েক বছরে পড়ে গেছে অনেকখানি।

এই নিষেধাজ্ঞায় শুধু যে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোই ইরানের সাথে কোন রকম বাণিজ্য করতে পারছেনা তাই নয়, অন্যান্য দেশের জন্যও ইরানের রাস্তা একপ্রকার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।