কয়েক দশকের মধ্যে ভয়াবহতম খরার মুখে উত্তর কোরিয়া

(image: Reuters)

উত্তর কোরিয়া বলেছে, তারা গত ৩৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর খরার মুখোমুখি হয়েছে।

দেশটির পক্ষ থেকে এই স্বীকারোক্তি এমন এক সময়ে এল যার কয়েকদিন আগেই জাতিসংঘ উদ্বেগের সাথে জানিয়েছে, দেশটির অন্তত ১০ মিলিয়ন নাগরিকের জন্য এখনই জরুরি খাদ্য সাহায্যের প্রয়োজন।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার একজন নাগরিক বর্তমানে দৈনিক গড়ে ৩০০ গ্রাম খাবার খেয়ে বেঁচে আছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।

নব্বইয়ের দশকে এক ভয়াবহ দূর্ভিক্ষে উত্তর কোরিয়ার কয়েক লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। এবছরের খরা দেশটিকে সেরকম অবস্থার দিকে নিয়ে যাবে, এমন পূর্বাভাস পাওয়া না গেলেও পরিস্থিতির দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। খরার কারণে উত্তর কোরিয়ার গ্রামাঞ্চল জুড়ে ফসলের কম উৎপাদন এবং ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে চলেছে, যার প্রেক্ষিতেই তৈরি হয়েছে এই খাদ্য সংকট।

রক্ষণশীল উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে কখনই নির্ভূল পরিসংখ্যান পাওয়া যায়না। আবার বাইরে থেকে করা প্রতিবেদনও দেশটিতে গিয়ে যাচাই করার তেমন সুযোগ নেই। তারপরও জাতিসংঘ কর্মকর্তারা ধারণা দিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় উত্তর কোরিয়ার জন্য কমপক্ষে ১.৫ মিলিয়ন টন খাদ্য সহায়তার প্রয়োজন।

কতটা খারাপ উত্তর কোরিয়ার খরা পরিস্থিতি

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমে জানানো হয়েছে, এবছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশটিতে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৫৪.৪ মিলিমিটার, যা ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন। দেশের কৃষক সমাজকে খরার হাত থেকে নিজেদের জমি ও ফসল বাঁচাতে ‘কঠিন যুদ্ধে’ অবতীর্ণ হতে আহবান জানানো হয়েছে সংবাদ মাধ্যমে।

গত মাসে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচী (ডব্লিউএফপি) এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এক যৌথ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, উত্তর কোরিয়ার কৃষি উৎপাদন ২০০৮ সালের পর এবারই সর্বনিম্ন পর্যায়ে হয়েছে।

জরুরি খাদ্য সাহায্য প্রয়োজন দেশটির ১০ মিলিয়ন নাগরিকের, যা মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ। তারা আরও আশংকা প্রকাশ করে বলেছে, মে থেকে সেপ্টেম্বরের ___ মৌসুমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে যদি এখনই ব্যবস্থা নেওয়া না হয়।

আর্থিক নিষেধাজ্ঞা কতটুকু ভূমিকা রেখেছে এই খাদ্য সংকটে?

মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দশকের পর দশক ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়েছে উত্তর কোরিয়া। তবে এর মাত্রা বেড়ে যায় ২০০৬ সাল থেকে, যখন বিপদজ্জনক পারমাণবিক বোমা বানানোর চেষ্টার অভিযোগ ওঠে দেশটির ওপর। এরই মধ্যে একাধিকবার মাটির নিচে পারমানবিক বিস্ফোরণ চালিয়েছে উত্তর কোরিয়া, পরীক্ষা চালিয়েছে একের পর এক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের, যার কোন কোনটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলেও আঘাত ঘানতে সক্ষম।

এসব নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে কমেছে উত্তর কোরিয়ার রপ্তানি বাণিজ্য। তাতে বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারে পড়েছে টান। ফলশ্রুতিতে বাইরে থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য কিনতে পারছেনা উত্তর কোরিয়া। আর দেশটির নিজস্ব খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাও সেকেলে। সব মিলিয়ে কিম জং উন নিজ দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষের মুখে পর্যাপ্ত খাদ্য তুলে দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

একদিকে পারমাণবিক শক্তিধর হওয়ার জন্য উত্তর কোরিয়ার জেদ, অন্যদিকে সেই জেদ কমানোর জেদে বিশ্বসম্প্রদায়ের একের পর এক নিষেধাজ্ঞায় নাভিশ্বাস উঠেছে দেশটির সাধারণ জনগণের।

উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক খরাগুলো

এর আগে সর্বশেষ ২০১৭ সালে বড়সড় খরার সম্মুখীন হয়েছিল উত্তর কোরিয়া। ব্যাপক হারে কমে গিয়েছিল দেশটির চাল, আলু, সয়াবিনের উৎপাদন।

তারও পূর্বে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিল। যার প্রেক্ষিতে ভয়াবহ দূর্ভিক্ষে প্রাণ হারায় কয়েক লক্ষ মানুষ। ততদিনে উত্তর কোরিয়ার প্রধান পৃষ্ঠপোষক সোভিয়েত ইউনিয়নেরও পতন ঘটায় খাদ্য সাহায্যের জন্য প্রথমবারের মত বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে আবেদন জানাতে হয় দেশটির তখনকার নেতা কিম জং ইলকে।

উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ সমীকরণ

পঞ্চাশের দশকে সমাজতন্ত্র গ্রহণ করার পর থেকেই ঐতিহাসিকভাবে উত্তর কোরিয়ার প্রধান শত্রু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পারমাণবিক অস্ত্র ইস্যুতে গত এক দশকে এই টানাপোড়েন আরও বেড়েছে। যদিও সম্প্রতি দু’দফায় বৈঠকে মিলিত হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং উত্তর কোরিয় নেতা কিম জং উন, কিন্তু মেলেনি সমাধানসূত্র। যুক্তরাষ্ট্র চায় আগে পরমাণু প্রকল্প ত্যাগ করুন কিম জং উন আর উত্তর কোরিয়া চায় আগে তুলে নেওয়া হোক নিষেধাজ্ঞা।