দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আজ, চ্যালেঞ্জের মুখে এএনসি

(Image: Reuters)

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণ দেশটির ষষ্ঠ জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছে। একসাথে হতে যাওয়া দক্ষিণ আফ্রিকার সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এবার রেকর্ড ৪৮ টি দল অংশ নিচ্ছে। দেশব্যাপী ২২,০০০ ভোটকেন্দ্রে ভোট দেবেন আড়াই কোটি নিবন্ধিত ভোটার।

ক্ষমতাসীন ‘আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ (এএনসি) থেকে নির্বাচিত দেশটির প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা ভোটারদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নিজ দলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার। রামাফোসার পূর্বসূরী জ্যাকব জুমা প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময় থেকেই এএনসি-র অভ্যন্তরে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে শুরু করে।

দীর্ঘ বর্ণবাদী শাসন প্রত্যক্ষ করা ভোটারদের মধ্যে এএনসি-র প্রতি এখনও সহানুভূতি কাজ করলেও নতুন প্রজন্ম, যারা সেসব দেখেনি, তারা আবেগের পরিবর্তে এএনসি-কে বিচার করে তাদের কাজ দিয়ে। মনে করা হয়, দুর্নীতি, বেকারত্ব, বৈষম্যের মত ইস্যুগুলোর কারণে দিন দিন এই তরুণ প্রজন্মের ভোট হারাচ্ছে এএনসি।

এর বাইরেও এএনসি-র মাথাব্যাথার কারণ হয়ে উঠেছে কট্টর বামপন্থী সংগঠন ‘ইকোনমিক ফ্রিডম ফাইটার্স’ এর উত্থান, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন এএনসি থেকে বেরিয়ে যাওয়া জনপ্রিয় নেতা জুলিয়াস মালিমা।

২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল ক্ষমতাসীন এএনসি। বেশ কয়েকটি গুরত্বপূর্ণ শহরের ক্ষমতা হাতছাড়া হয়ে যায় দলটির।

মূলত জ্যাকব জুমার সময় থেকেই এএনসি-র প্রতিদ্বন্দী হিসেবে উঠে আসে প্রধান বিরোধীদল ‘ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স’ এবং জুলিয়াস মালিমার ‘ইকোনমিক ফ্রিডম ফাইটার্স’। পত্রিকার পাতায় নিয়মিত প্রকাশ হতে থাকা সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে নিজেদের পক্ষে টেনে আনতে পেরেছিল দল দু’টি। জ্যাকব জুমা অবশ্য ক্রমাগতভাবে অস্বীকার করে এসেছেন দুর্নীতির অভিযোগগুলো।

জ্যাকব জুমা ভাবমূর্তি সংকটে ভূগলেও তার উত্তরসূরী বর্তমান প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার সে সমস্যা নেই, অন্তত এখন পর্যন্ত। একসময়ের ট্রেড ইউনিয়নের নেতা থেকে পরবর্তীতে সফল ব্যবসায়ী হয়ে ওঠা রামাফোসার প্রতি ব্যাপক সমর্থন রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যবিত্ত সমাজের। স্বচ্ছ ভাবমূর্তির রামাফোসাকে অনেকেই জ্যাকব জুমার বিপরীত প্রতিরূপ হিসেবে দেখেন।

তবে ভিন্নমত পোষণ করা লোকের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। নেলসন ম্যান্ডেলার আদি বাড়ির অদূরে সোয়েতো শহরে দেখা গেল পরিবর্তনের ক্ষুধা। ভোরবেলা ভোটদানের লাইনে দাঁড়ানো কয়েকজনের মধ্যে এডি জোয়ি বলছিলেন, “আমরা ভোট দিচ্ছি পরিবর্তনের জন্য, আমরা ভোট দিচ্ছি আমাদের এবং আমাদের সন্তানদের উন্নত ভবিষ্যৎের জন্য।’’ তার মতে, সাধারণ মানুষ দুর্নীতি আর অপরাধ নিয়েই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।

দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক মানুষের কাছেই এখন মৌলিক চাহিদা ঠিকমত পূরণ করতে পারাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ধনবৈষম্য বর্তমানে বিরাজ করছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। দেশটির ধনী পরিবারগুলোর হাতে থাকা সম্পদের পরিমান দরিদ্র পরিবারগুলোর চেয়ে প্রায় ১০ গুণ পর্যন্ত বেশি।

উল্লেখ করার মত বিষয় হল, বিপুল সংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ জনগণ মধ্যবিত্তের তালিকায় উঠে এলেও এখনও অস্বাভাবিক মাত্রায় সম্পদের মালিক হয়ে রয়েছেন শ্বেতাঙ্গরা। ২০১৮ সালে প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে জানানো হয়, অতীতের অ্যাপার্থাইড শাসনের মত বর্তমান সময়েও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে সীমিত সম্পদ, কম কর্মকক্ষতা, স্বল্প বেতন, কর্মহীনতার মত সমস্যাগুলোর প্রকোপ খুব বেশি, যেখানে ফুলে ফেঁপে উঠছে অভিজাত ধনীক শ্রেণী, যাদের সিংহভাগই শ্বেতাঙ্গ।

জমির মালিকানা : দক্ষিণ আফ্রিকার কঠিনতম রাজনৈতিক ইস্যু?

রোজগার ও অর্থসম্পদের মত জমি নিয়ে বৈষম্যও দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু। বর্ণবাদী অ্যাপার্থাইড সরকারগুলোর সময়ে শ্বেতাঙ্গরা কখনও স্বল্পমূল্যে কিনে, কখনও জবরদখল করে কৃষ্ণাঙ্গদের জমি হাতিয়ে নিত। দশকের পর দশক ধরে চলা এই অন্যায়ের সুবাদে স্বল্প সংখ্যক শ্বেতাঙ্গের হাতে কুক্ষীগত হয়ে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপুল পরিমান জমি। বর্ণবাদ অবসানের পর প্রায় আড়াই দশক পার হলেও সুরাহা হয়নি এই বিষয়টির, যা নিয়ে ক্ষোভ রয়ে গেছে বিশেষ করে জমিহারা কৃষ্ণাঙ্গ ও তাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে।

আর এই ক্ষোভকে পুঁজি করেই নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি বাড়িয়ে নিতে পেরেছে ‘ইকোনমিক ফ্রিডম ফাইটার্স’ এর মত দলগুলো। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কখনও ক্ষমতায় যেতে পারলে জমি ও কাজের মালিকানা ফিরিয়ে দেয়া হবে গরিব কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে। যদিও অনেকের মতেই, এমন প্রতিশ্রুতি শুনতে ভাল লাগলেও কার্যক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অসম্ভব।

জমি ইস্যু মীমাংসা করার প্রতিশ্রুতি ১৯৯৪ সালে প্রথমবার ক্ষমতাসীন হওয়ার সময় এএনসি-ও দিয়েছিল। কিন্তু গত ২৫ বছর ক্ষমতায় থেকেও তারা খুব একটা কিছু করে দেখাতে পারেনি, উল্টো জমি নিয়েও দুর্নীতি করার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইচ্ছা থাকলেও শ্বেতাঙ্গদের কাছ থেকে জমি ফিরিয়ে নেওয়া এএনসি বা যেকোন দলের জন্যই খুব কঠিন। কারণ শ্বেতাঙ্গরা বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার সুবাদে দেশটির সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারীও বটে। ফলে প্রেসিডেন্ট রামাফোসা যে নতুন ‘আর্থিক সূর্যোদয়’ এর স্বপ্ন দেশবাসীকে দেখান, শ্বেতাঙ্গদের ক্ষুব্ধ করলে তা পূরণ করা কোনভাবেই তার পক্ষে সম্ভব হবেনা।

শিল্পায়নের দিক থেকে গোটা আফ্রিকা মহাদেশে এখনও এক নম্বর অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, বিদ্যুৎ সংকট, দূর্বল পরিষেবার কারণে বর্তমানে ধুঁকছে এই খাত। এসব নিয়ে দেশটির স্থানীয় পর্যায়ে প্রায়ই প্রতিবাদ, বিক্ষোভ হয়।

আর এতকিছু নিয়ে রীতিমত বিরক্ত দেশটির তরুণ প্রজন্ম। জানলে অবাক হবেন, দেশটির ৬০ লাখ তরুণ-তরুণী এবারের নির্বাচনে নিজেদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধনই করাননি।

রাজধানী জোহানেসবার্গের ২৪ বছর বয়সী ফ্যাশন ডিজাইনার উইলসন নেনবে বলছিলেন, “আমরা কবে স্বাধীনতা পেয়েছিলাম? ১৯৯৪ সালে? এতগুলো বছর তো শুধু প্রতিশ্রুতিই দিয়ে গেল। এখনও কি বিপুল সংখ্যক কালো মানুষ কষ্ট পেয়ে যাচ্ছে।’’

স্বাভাবিকভাবেই উইলসনও ওই ৬০ লাখের একজন!