শীর্ষ নেতাদের কারাদন্ডের প্রতিবাদে আবার বিক্ষোভ কাতালোনিয়ায়

শীর্ষ নেতাদের কারাদন্ডের প্রতিবাদে আবার বিক্ষোভ কাতালোনিয়ায়
স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনের শীর্ষনেতাদের কারাদন্ডের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এভাবেই আবার বিক্ষোভ শুরু করেছে কাতালোনিয়ার মানুষ (Image: Reuters)
স্পেনের স্বাধীনতাকামী রাজ্য কাতালোনিয়ার শীর্ষনেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে বার্সেলোনায় আয়োজিত বিক্ষোভ কর্মসূচীকে ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে দাঙ্গা পুলিশ এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে।

এর আগে কাতালোনিও নেতাদের মুক্তির দাবিতে শুক্রবার শহরজুড়ে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়। এছাড়া পাঁচটি বড় মিছিলের আয়োজন করা হয় পৃথক পৃথক স্থানে, যেগুলো বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে শহরের কেন্দস্থলে এসে একসাথে মিলিত হয়। ধর্মঘট ও শহরজুড়ে চলা মিছিলের কর্মসূচী ঘিরে কার্যত অচল হয়ে পড়ে পুরো বার্সেলোনা শহর।

পুলিশ বলেছে, শুক্রবারের মিছিলগুলোতে প্রায় ৫ লক্ষাধিক লোক অংশ নিয়েছে।

এদিকে বিক্ষোভকারীরা স্পেন ও ফ্রান্সের সীমান্তবর্তী একটি মহাসড়ক অবরোধ করে দেয়, যার জেরে সড়কটিতে বড় আকারের যানজটের সৃষ্টি হয়।

স্পেনের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুরো কাতালোনিয়া প্রদেশজুড়ে শুক্রবার ১৭ বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে পুলিশ। বিভিন্ন স্থানে ঘটা সংঘর্ষের ঘটনায় ৬২ জন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৪১ জনই বার্সেলোনায় আহত হয়েছেন।

স্থানীয় কাতালান নেতা কুইম তোরা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দেখানোর জন্য আন্দোলনকারীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। একইসাথে সংঘাত সৃষ্টিকারীদের প্রতি নিন্দা জানান তিনি।

কুইম তোরা আরও বলেন, “শীর্ষ কাতালান নেতাদের গ্রেফতার করা হলেও স্বাধীনতার জন্য আমাদের আন্দোলনকে নিবৃত করা যাবেনা। আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের জন্য আবারও ব্যালট বাক্সের কাছে যাব।”

এদিকে বিচ্ছিনতাবাদীদের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে স্পেন সরকার। দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো স্যানচেজ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে, তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হবে।

স্পেনের ভারপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্ড-মার্লাস্কা জানিয়েছেন, পাঁচদিন আগে শুরু হওয়া বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে শুক্রবার পর্যন্ত পুরো কাতালোনিয়া প্রদেশ জুড়ে ১৩০ জনের মত লোককে আটক করা হয়েছে। তিনিও সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যারা সহিংসতার আশ্রয় নেবে তাদের ছয় বছর পর্যন্ত কারাদন্ডের মুখোমুখি হতে হবে।

সর্বশেষ কি পরিস্থিতি?

মুখোশ পড়া বিক্ষোভকারীরা শুক্রবার বার্সেলোনায় পুলিশ সদর দপ্তরের কাছে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তারা পুলিশের দিকে পাথর, বোতল, ক্যান ছুঁড়ে মারে। বিক্ষোভকারীরা ময়লায় ডাস্টবিন সড়কে নিয়ে এসে সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

নিরাপত্তাবাহিনী টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুঁড়ে এবং জলকামান ব্যবহার করে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়।

দেশের উত্তর অংশে ফ্রান্সের সাথে দেশটির সীমান্তে অবস্থিত ‘লা জংকুয়েরা’ সড়কটিতে ২০০ জন বিক্ষোভকারী অবস্থান নিলে এটিতে যান চলাচল বন্ধ করে দেয় নিরাপত্তাবাহিনী। এটিসহ পুরো প্রদেশজুড়ে ২০ টির মত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক আন্দোলনকারীরা অবরোধ করে বলে জানিয়েছে সেখানকার সংবাদমাধ্যম।

এদিকে চলমান অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে এল ক্লাসিকো ফুটবল লিগে ২৬ অক্টোবর বার্সেলোনা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের মধ্যকার ম্যাচ বাতিল করা হয়েছে।

শীর্ষ নেতাদের কারাদন্ডের প্রতিবাদে আবার বিক্ষোভ কাতালোনিয়ায়
কাতালানদের প্রধান নেতা কার্লেস পুজেমন্ট (Image: Reuters)

কেন নতুন করে শুরু হল বিক্ষোভ?

স্পেন থেকে বেরিয়ে স্বাধীনতা লাভের জন্য বহু দশক ধরেই চেষ্টা চালিয়ে এসেছে এর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ কাতালোনিয়া। স্বাধীনতার প্রশ্নে ২০১৭ সালে এক গণভোটের আয়োজন করে কাতালোনিয়ার প্রাদেশিক সরকার। তাতে স্বাধীনতার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়লে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে দেয় কাতালোনিয়া। এই পদক্ষেপকে ‘অবৈধ’ উল্লেখ করে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতাপন্থী শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করে স্পেন সরকার।

গত সোমবার বহুল আলোচিত সেই মামলার রায় ঘোষণা করে স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট। সেই রায়ে কাতালোনিয়ার নয়জন শীর্ষ স্বাধীনতাপন্থী নেতাকে ৯ থেকে ১৩ বছর পর্যন্ত কারাদন্ডের আদেশ দেয় আদালত। আরও তিনজন নেতাকে করে জরিমানা। আর এতেই নতুন করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে কাতালোনিয়া প্রদেশজুড়ে।

তবে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান নেতা এবং প্রদেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট কার্লেস পুজেমন্ট ২০১৭ সালের গণভোটের পর স্পেনিশ নিরাপত্তাবাহিনীর ধরপাকড় শুরু হলে বেলজিয়ামে চলে যান। তাকে ফেরৎ পাঠানোর জন্য তখন থেকেই দাবি জানিয়ে আসছে স্পেন।

কেন স্বাধীনতা চায় কাতালানরা?

কাতালোনিয়ার অধিবাসীরা নিজেদেরকে স্প্যানিশ হিসেবে গণ্য করেনা। তাদের বক্তব্য, কা্তালোনিয়ার রয়েছে ১০০০ বছরের স্বতন্ত্র্য ঐতিহ্য, নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়। তাই তারা জাতিগতভাবে স্প্যানিশ নয়, কাতালান। ফলে স্পেনের অন্তর্গত হয়ে থাকাটাও তাদের কাছে অযৌক্তিক। একারণেই তারা স্পেন থেকে বেরিয়ে স্বাধীন কাতালান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দবি জানিয়ে আসছে বহু যুগ ধরে।

স্পেনের প্রতি কাতালানদের ক্ষোভের আরেকটি কারণ হল তাদের ভাষায় ‘অর্থনৈতিক বৈষম্য’। কাতালোনিয়া প্রদেশ আর্থিকভাবে বেশ সমৃদ্ধ। কিন্তু কাতালানদের অভিযোগ, তাদের পরিশোধ করা বিপুল পরিমান করের টাকার সিংহভাগই ব্যয় করা হয় স্পেনের অন্যান্য অঞ্চলের পেছনে, যা তাদের মতে ব্যবহার করার কথা কাতালোনিয়ার উন্নয়নে।