আগাম নির্বাচনের প্রস্তাব দিলেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো

(image: Reuters)

এক অপ্রত্যাশিত ঘোষণায় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো দেশটির জাতীয় পরিষদের আগাম নির্বাচন করার প্রস্তাব দিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার বর্তমান সংসদের নেতৃত্বে রয়েছেন সাম্প্রতিক সময়ে মাদুরোকে প্রবলভাবে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে যাওয়া বিরোধী নেতা জুয়ান গুয়াইদো।

রাজধানী কারাকাসে এক সভায় সমর্থকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট মাদুরো অবশ্য নির্বাচনের জন্য সুনির্দিষ্ট কোন তারিখ প্রস্তাব করেননি। বর্তমান মেয়াদে ভেনেজুয়েলার সংসদের মেয়াদ রয়েছে ২০২০ সালের শেষার্ধ পর্যন্ত।

২০১৬ সালের সংসদ নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল সোশ্যালিস্ট পার্টি পরাজিত হওয়ার পর থেকে নিকোলাস মাদুরো বিভিন্ন সময়ে নানা উপায়ে সংসদের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা খর্ব করে দিয়েছেন।

গত বছর অনুষ্ঠিত ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিকোলাস মাদুরোকে বিজয়ী ঘোষণা করা হলেও, নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে বিরোধী নেতা জুয়ান গুয়াইদো ঘোষিত ফলাফল প্রত্যাখান করে নিজেকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে দাবি করেন।

যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ গুয়াইদোকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অন্যদিকে রাশিয়া, তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ সমর্থন জানায় নিকোলাস মাদুরোর প্রতি।

বিতর্কিত সেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বকতব্য রাখতে গিয়ে অকস্মাৎ আগাম সংসদ নির্বাচনের এই প্রস্তাব দেন নিকোলাস মাদুরো। তিনি বলেন, “আসুন নির্বাচনের আয়োজন করি, একটি সমাধানে পৌঁছাই… শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক।’’

বিরোধীদলের বয়কট ও ভোটে অনিয়মের ব্যাপক অভিযোগের মধ্যে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সমর্থকদের সামনে বলেন, “আমরা গণতান্ত্রিকভাবে নিজেদের বিচার করে দেখতে চাই। সেইজন্য আমরা জাতীয় পরিষদের নির্বাচন এগিয়ে আনতে যাচ্ছি।’’

গত বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে নিকোলাস মাদুরোর বিপুল সংখ্যক সমর্থক রাজধানী কারাকাসের রাজপথে জড়ো হয়। তাদের পরনে ছিল লাল টি-শার্ট, হাতে ছিল ‘জয়ের জন্য যাত্রা’ লেখা ব্যানার।

অন্যদিকে ২০১৬-র নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের কর্তৃত্ব হারানোর পর এর বিকল্প হিসেবে ২০১৭ সালে মাদুরো ‘জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদ’ নামে যে কাউন্সিল গঠন করিয়েছিলেন, সেটি গত সোমবার নিজেদের মেয়াদ ২০২০ সালের শেষ পরযন্ত বর্ধিত করিয়ে নিয়েছে। গঠনের সময় এর মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল দুই বছর।

প্রেসিডেন্ট মাদুরো এই পরিষদটি গঠন করিয়েছিলেন নিজ সরকারের একান্ত অনুগতদের দিয়ে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে তিনি জাতীয় পরিষদের সাংবিধানিক ক্ষমতা যতটা কমিয়েছেন, ততটাই বাড়িয়েছেন নতুন তৈরি করা জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদের ক্ষমতা। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার ওপর নিজের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া দেশটির সংসদ পদে পদে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, এই আশঙ্কায় নিজের অনুগতদের দিয়ে নতুন আরেকটি ‘সংসদ’ বানিয়ে নিয়েছেন মাদুরো এবং ধীরে ধীরে এর ক্ষমতা বাড়াতে বাড়াতে পুরনো সংসদটিকে একসময় অকার্যকার ও তারপর বিলুপ্ত করে দিতে পারেন তিনি।


ঘটনার প্রেক্ষাপট

গত বছর মে মাসে হয়ে যাওয়া বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর থেকেই ক্ষমতাসীন নিকোলাস মাদুরো এবং বিরোধী দলনেতা জুয়ান গুয়াইদোর বিরোধ চরমে ওঠা। মে মাসের নির্বাচন বাতিল করে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছেন গুয়াইদো, যা ক্রমাগত প্রত্যাখান করে চলেছেন মাদুরো।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও লাতিন আমেরিকার সিংহভাগ রাষ্ট্রসহ পৃথিবীর প্রায় ৫০টি দেশ জুয়ান গুয়াইদোকে দেশটির বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি জানিয়েছে। অন্যদিকে নিকোলাস মাদুরো সমর্থন পেয়েছেন আরেক পরাশক্তি রাশিয়ার।

গত মাসে ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীতে গুয়াইদোর সমর্থকরা একটি অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিল বলে ধারণা করা হয়। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সেটি ব্যর্থ করে দিয়ে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রতিই আনুগত্য প্রকাশ করে দেশটির সামরিক বাহিনী। এই ঘটনার পর থেকেই বিরোধী নেতাদের ওপর ধরপাকড় শুরু করেছে মাদুর প্রশাসন। দেশটির সর্বোচ্চ আদালত বিরোধীদলের ১৪ জন সংসদ সদস্যকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও ষড়যন্ত্রের দায়ে অভিযুক্ত করেছে।

প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অভিযোগ করেছেন, জুয়ান গুয়াইদো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদতেই তাকে ক্ষমতাচ্যূত করতে এই অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিলেন।

তবে শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায় এবং রাশিয়া, চীন, তুরস্কের মত দেশগুলোর সমর্থনে এখনও পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েসছেন নিকোলাস মাদুরো।

ভেনেজুয়েলার সাবেক কট্টর বামপন্থী প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের অকালমৃত্যুর পর ক্ষমতায় বসেন তার একান্ত অনুগত হিসেবে পরিচিত নিকোলাস মাদুরো। তার শাসনামলে দেশটির অর্থনীতি কার্যত ভেঙে পড়েছে। খাবার ও ওষুধের সংকট ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। অভাবের তাড়নায় দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে পাড়ি জমিয়েছেন ভেনেজুয়েলার প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ।

বিরোধী দলগুলো তেল সমৃদ্ধ দেশটির এই পরিস্থিতির জন্য নিকোলাস মাদুরোর অদক্ষতা ও স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতাকেই দায়ী করেছেন। অন্যদিকে মাদুরোর অভিযোগ, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মদতে হওয়া অর্থনৈতিক যুদ্ধের শিকার।