সামরিক কুচকাওয়াজে বিদায় জানানো হল চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মারকেলকে

বিদায় অনুষ্ঠানে ভাষণ দিচ্ছেন আঙ্গেলা মারকেল (Image: Reuters)

দীর্ঘ ১৬ বছর ‘রাজত্বের’ পর অবশেষে ক্ষমতাকে বিদায় জানালেন জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মারকেল। বর্তমান ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসা এই নেতা স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন জার্মানির নবনির্বাচিত সরকারের কাছে।

বিদায়ের প্রাক্কালে বৃহস্পতিবার রাতে আঙ্গেলা মারকেলের উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী সামরিক মশাল মিছিলের। দেশের প্রতিটি বিদায়ী সরকার প্রধানকে বিশেষ এই প্যারেডের মাধ্যমেই সম্মান জানিয়ে থাকে জার্মান সেনাবাহিনী।

সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা বিপদগ্রস্থ বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে নিজ দেশে আশ্রয় দিয়ে সারাবিশ্বের সম্মান ও ভালোবাসা কুড়িয়েছিলেন আঙ্গেলা মারকেল। আশ্রয় পাওয়া শরণার্থী এবং মানবতাবাদীদের কাছে তিনি পরিচিতি পান ‘মামা মারকেল’ (মা মারকেল) নামে। এমনকি নোবেল শান্তি পুরষ্কারের জন্যও একসময় বিবেচিত হয়েছিল তার নাম।

তবে শরণার্থীদের জন্য স্বদেশের দরজা উদারভাবে খুলে দেওয়ায় জার্মানি তথা ইউরোপের কট্টরপন্থী সমাজের বিরাগভাজনও হতে হয়েছিল তাকে। এছাড়া করোনা মোকাবেলায় তার সরকারের আরোপিত কড়াকড়িও ক্ষুব্ধ করে জার্মানদের একাংশকে।

তাই বিদায়বেলায় দলমত নির্বিশেষে সকলের শ্রদ্ধা পেয়ে গেলেও, জার্মানিকে মারকেল খুব একটা স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রেখে যেতে পারলেননা বলেই অভিমত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

বিদায়ের অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে আঙ্গেলা মারকেল বলেন, গত ষোল বছরে চ্যান্সেলর হিসেবে আমি নানা ঘটনার সাক্ষী থেকেছি। এগুলোর কোন কোনটি আমার জন্য ছিল ভীষণ চ্যালেঞ্জের.. কোনটা রাজনৈতিকভাবে কোনটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে।

তার স্থলাভিষিক্ত হতে যাওয়া নতুন চ্যান্সেলর ওলাফ স্কলৎজ এবং তার সরকারের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে মারকেল বলেন, সামনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার দায়িত্ব এখন নতুন সরকারের। আমি তাদের শুভকামনা জানাই এবং সর্বাত্মক সাফল্য প্রত্যাশা করি।

২০০৫ সালে গেরহার্ড শ্রোয়েডারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর একটানা ১৬ বছর জার্মানিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন আঙ্গেলা মারকেল। ২০১৮ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন পরবর্তী নির্বাচনে আর অংশ না নেওয়ার।

এবছর অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ ফল করে মারকেলের দল ‘খ্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটস’। একদিকে মারকেলের যোগ্য উত্তরসূরীর অভাব, অন্যদিকে উদার অভিবাসন নীতি, করোনা নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়িসহ তার সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের দরুণ সৃষ্ট অসন্তোষের জেরে নির্বাচনে আসন সংখ্যা অনেকটা কমে যায় মারকেলের দলের। ফলে যতটা আনন্দ ও আড়ম্বরের সাথে আঙ্গেলা মারকেলকে তার সমর্থকেরা বিদায় দিতে পারতেন, শেষপর্যন্ত ততটা হলনা।

আগামী সপ্তাহে জার্মান সংসদের অনুমোদনের পর দায়িত্ব পালন করা শুরু করবে দেশটির নতুন সরকার।

মারকেলের সাফল্য ও ব্যর্থতা

আঙ্গেলা মারকেল তার শাসনামলে পুরো ইউরোপের অনানুষ্ঠানিক একক নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যুতে ব্রিটেন (ব্রেক্সিটের আগে), ফ্রান্স কিংবা ইতালির তুলনায় সক্রিয় ও কার্যকর অবস্থান নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান শরিকে পরিণত হতে পেরেছিল মারকেলের জার্মানি।

তবে ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময় তার নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ সমালোচিত হয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে। এছাড়া সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলাকালীন প্রায় ১০ লক্ষ শরণার্থীকে জার্মানিতে আশ্রয় দিয়ে সারাবিশ্বের প্রশংসা পেলেও এর প্রতিক্রিয়ায় সমগ্র ইউরোপজুড়ে অভিবাসন বিরোধী কট্টরপন্থী দলগুলোর উত্থানের জন্য তার ঐ সিদ্ধান্তকেই দায়ী করেন অনেকে।

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময় বেশকিছু কড়া পদক্ষেপ নিয়ে জার্মানিতে মৃত্যু ও আক্রান্তের হার প্রশংসনীয়ভাবে কম রাখতে পেরেছিলেন আঙ্গেলা মারকেল। কিন্তু ঐ পদক্ষেপগুলোর জেরেই বহু মানুষের কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিরূপ প্রভাব পড়ায় তা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জার্মানের কাছে মারকেলকে অজনপ্রিয় করে তোলে।

এছাড়া তার বিরুদ্ধে জার্মানির বাণিজ্য স্বার্থ দেখতে গিয়ে চীন ও রাশিয়া ইস্যুতে নমনীয় মনোভাব দেখানোর অভিযোগ করেন মারকেলের বিরোধীরা। জার্মানিকে তিনি রাশিয়ার গ্যাসের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল করে তুলেছেন বলেও দাবি সমালোচকদের। তবে ক্রিমিয়া দখল কিংবা রুশ বিরোধী নেতা আলেক্সাই নাভালনিকে কারাদন্ড ও বিষপ্রয়োগের মত ইস্যুতে মস্কোর বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের জারি করা নিষেধাজ্ঞায় পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন আঙ্গেলা মারকেলের।