চীনবিরোধী নতুন জোট গড়ল যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া

ভার্চুয়াল সম্মেলনে নতুন জোটের আত্মপ্রকাশে জো বাইডেন, বরিস জনসন ও স্কট মরিসন (Image: Reuters)

নতুন এক জোটের জন্ম হল বিশ্বমঞ্চে। ইংরেজীভাষী তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে ঐতিহাসিক এক নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করল নতুন এক আন্তর্জাতিক জোট, যার নাম ‘অকাস’ (AUKUS)।

স্বাক্ষরিত চুক্তিটি অনুযায়ী, পরমাণু শক্তিধর যুক্তরাষ্ট্র জোটের শরিক অস্ট্রেলিয়াকে ১২ টি পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরিতে সহায়তা করবে।

আনুষ্ঠানিকভাবে না বললেও চুক্তিটির ধরন ও ব্যাপ্তি দেখে সহজেই অনুমেয় যে বিশ্বজুড়ে ক্রমাগত প্রভাব বিস্তার করতে থাকা চীনকে সামরিকভাবে মোকাবেলা করতেই এই জোটের আবির্ভাব।

জোটটির নামকরণ করা হয়েছে এর সদস্য তিন দেশের নামের অদ্যাক্ষর দিয়ে। ইংরেজী A অক্ষর দিয়ে Australia, UK দিয়ে United Kingdom এবং US দিয়ে United States বোঝানো হয়েছে। পুরোটা মিলে AUKUS।

আজ এক যৌথ ভার্চুয়াল সম্মেলনে ‘অকাস’ জোটের সূচনা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও অস্ট্রেলিও প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন। নিজেদের বক্তৃতায় সরাসরি চীনের নাম না নিলেও তিন নেতাই আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে ঝুকি দিন দিন বেড়ে যাওয়াকে তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিপক্ষ এখন চীন। অন্যদিকে দক্ষিণ-চীন সাগর এলাকায় চীনের ক্রমাগত সামরিক শক্তি বাড়ানো নিয়ে উদ্বিগ্ন নিকটবর্তী দেশ অস্ট্রেলিয়া। অর্থনীতিসহ নানা ইস্যুতে চীনের সাথে মতভেদ রয়েছে ব্রিটেনেরও।

চীনকে নিয়ে অভিন্ন এই উদ্বেগই একত্রিত করেছে ভৌগোলিকভাবে একটি আরেকটি থেকে বহুদূরে থাকা এই তিন দেশকে। মজার বিষয় হল, ‘অকাসের’ তিন সদস্য বিশ্বের পৃথক পৃথক তিন মহাদেশের অংশ। যুক্তরাষ্ট্র উত্তর আমেরিকা মহাদেশ, যুক্তরাজ্য ইউরোপ মহাদেশ এবং অস্ট্রেলিয়া অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে অবস্থিত।

আকস্মিক এই চুক্তি স্বাক্ষর এবং জোট গঠন নিয়ে স্বভাবতই ক্ষুব্ধ চীন। এক কড়া প্রতিক্রিয়ায় তিন দেশের এই চুক্তিকে ‘চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন’ হিসেবে অভীহিত করেছে চীন।

দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, এই চুক্তি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে বাড়িয়ে তুলবে।

যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিতে ১২ টি সাবমেরিন নির্মাণের বিষয়টিই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলেও এতে সামরিক সহযোগিতার আরো বেশ কিছু পদক্ষেপ সংযুক্ত রয়েছে। দেশ তিনটি এখন থেকে একে অন্যের সাথে নিজেদের সাইবার সক্ষমতা আদানপ্রদান করবে। এছাড়া গভীর সমুদ্রের প্রযুক্তি সংক্রান্ত নিজেদের জ্ঞানও বিনিময় করবে দেশগুলো।

চীনের সাথে অস্ট্রেলিয়ার ক’দিন আগ পর্যন্তও সুসম্পর্ক থাকলেও সম্প্রতি বাণিজ্য ও কূটনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে এই সম্পর্কে ফাটল ধরে। তারপর থেকেই চীনবিরোধী অক্ষে নিজেদের অংশগ্রহণ বাড়াতে থাকে অস্ট্রেলিয়া।

এদিকে এই চুক্তি শুধু যে চীনকে রাগিয়ে দিয়েছে তাই নয়, অন্য একটি কারণে ক্ষুব্ধ করেছে ফ্রান্সকেও। অস্ট্রেলিয়াকে যে ১২ টি সাবমেরিন যুক্তরাষ্ট্র বানিয়ে দেবে বলে ‘অকাস’-র চুক্তিতে সমঝোতা হয়েছে, আদতে সেগুলো তৈরি করে দেওয়ার কথা ছিল ফ্রান্সের। ফরাসি সরকারের সাথে এই নিয়ে বেশ আগেই চুক্তিও করেছিল অস্ট্রেলিও সরকার।

কিন্তু এখন নতুন চুক্তির আওতায় এই কাজের বরাত যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়ার অর্থই হল ফ্রান্সের সাথে করা আগের চুক্তিটি বাতিল করে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া।

একে তো ১২ টি সাবমেরিন নির্মাণ বাবদ বিপুল অঙ্কের আয় থেকে বঞ্চিত হওয়া, তার ওপর তাদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে আগের চুক্তি থেকে বেরিয়ে কাজটি অন্যকে দিয়ে দেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই অপমানিত ফ্রান্স।

ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘটনাকে ‘পেছন থেকে ছুরি মারা’ হিসেবে অভীহিত করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

কেন পারমাণবিক সাবমেরিন?

প্রচলিত সাবমেরিনের চেয়ে পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিনের গতি হয় অনেক বেশি। রাডারে এগুলোকে সহজে সনাক্ত করা যায়না। এই ধরনের সাবমেরিন মাসের পর মাস ডুবে থাকতে পারে গভীর সমুদ্রের তলদেশে। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা যায় এসব সাবমেরিন থেকে। আবার বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র পরিবহনও করা যায়।

সাবমেরিনগুলো হাতে আসার পর অস্ট্রেলিয়া পরিণত হবে বিশ্বের সপ্তম দেশে যাদের সামরিক ভান্ডারে পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন রয়েছে। বর্তমানে এমন সাবমেরিনের মালিক কেবল যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ভারত।

তবে অস্ট্রেলিয়া স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, পারমাণবিক সাবমেরিন পাওয়ার উদ্যোগ নিলেও পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর বা পাওয়ার কোন পরিকল্পনা তাদের নেই।