রাণী এলিজাবেথকে হটিয়ে প্রজাতন্ত্র হিসেবে যাত্রা শুরু করল বারবাডোজ

বারবাডোজের প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের অনুষ্ঠানে দেশটির নবনিযুক্ত রাষ্ট্রপতির সাথে প্রধানমন্ত্রী ও ব্রিটিশ যুবরাজ চার্লস (Image: Reuters)

দীর্ঘ ৩৯৬ বছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে নিজেদের মুক্ত করে নিল দেশটির একসময়ের উপনিবেশ বারবাডোজ। ক্যারিবীয় অঞ্চলের এই ছোট্ট দ্বীপটি সোমবার মধ্যরাতে পৃথিবীর নবীনতম প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল।

একটানা প্রায় চার শতাব্দী ধরে ব্রিটেনের শাসনাধীন থেকেছে বারবাডোজ। ব্রিটিশ রাজা কিংবা রাণীই এতদিন ছিলেন ক্ষুদ্র এই দেশটির আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান। সর্বশেষ রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ছিলেন ববারবাডোজের আলংকারিক অভিভাবক।

তবে বেশ ক’বছর ধরেই বারবাডোজের জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশের প্রেক্ষিতে দেশটির ভেতরেই দাবি উঠতে থাকে ব্রিটেনের সাথে প্রাচীন ঔপবিবেশিক সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক ইতি টেনে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের। যে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হবেন বারবাডোজেরই কোন নাগরিক।

সেইমত সাম্প্রতিক সময়ে প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে বারবাডোজ সরকার। এই প্রক্রিয়ায় সর্বপ্রকার সহযোগিতা করে ব্রিটিশ সরকারও।

সোমবার দেশটির রাজধানী ব্রিজটাউনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাণী এলিজাবেথের পরিচয়সূচক ব্রিটিশ রাজকীয় পতাকা নামিয়ে আনার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয় বারবাডোজে ব্রিটিশ শাসন।

অনুষ্ঠানে রাণীর প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তার পুত্র প্রিন্স চার্লস। রাণী এলিজাবেথের স্থলাভিষিক্ত হয়ে বারবাডোজের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন ডেইম স্যান্ড্রা মেসন। তাকে শপথ পড়ান বারবাডোজের প্রধান বিচারপতি। উপস্থিত জনতা হর্ষধ্বনি দিয়ে দেশের নতুন রাষ্ট্রপ্রধানকে শুভেচ্ছা জানান।

এসময় বারবাডোজের জাতীয় সংগীত বেজে ওঠে এবং ২১ বার তোপধ্বনি করে অভিবাদন জানায় সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। জনপ্রিয় মার্কিন গায়িকা রিহানা, যার শেকড় মূলত বারবাডোজে, উপস্থিত ছিলেন আজকের আয়োজনে। অনুষ্ঠানে রিহানাকে বারবাডোজের ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

বারবাডোজের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রপতি স্যান্ড্রা মেসন তার ভাষণে বলেন, জটিল, ভঙ্গুর ও অস্থির পৃথিবীর বুকে এবার একা পথ চলা শুরু করতে যাচ্ছে বারবাডোজ প্রজাতন্ত্র। আমাদের দেশকে বড় স্বপ্ন দেখতে হবে এবং সেগুলোকে পূরণ করার জন্য কাজ করে যেতে হবে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রিন্স চার্লস তার বক্তব্যে বলেন, প্রজাতন্ত্র হিসেবে বারবাডোজের উদয় এক নতুন প্রত্যাশার সূচনা করল। তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের ভূলত্রুটির কথা স্মরণ করে বলেন, অতীতের কালো অধ্যায় এবং দাসপ্রথার নিপীড়ন, যা আমাদের ইতিহাসে সারাজীবনের জন্য কালো দাগ হয়ে থাকবে, সেগুলোকে পেছনে ফেলে এই দ্বীপের মানুষ অসামান্য সহিষ্ণুতা দিয়ে নিজেদের ভাগ্য নির্মাণ করেছে।

আজকের অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বারবাডোজের প্রধানমন্ত্রী মিয়া মটলি, ২০২০ সালে যিনিই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছিলেন ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সাথে বারবাডোজের সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত।

সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, বারবাডোজের ৬০ শতাংশ নাগরিকই ব্রিটেন থেকে দেশটির বিচ্ছিন্ন হওয়াকে সমর্থন করেন। ১০ শতাংশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকার পক্ষে। তবে উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক নাগরিকের বারবাডোজের প্রজাতন্ত্র হওয়া কিংবা ব্রিটেনের অংশ হয়ে থাকা, কোনটা নিয়েই কোন মাথাব্যাথা নেই বলেও উঠে এসেছে জরিপটিতে।

বারবাডোজের প্রজাতন্ত্র হতে চাওয়ার শুরু ১৯৬৬ সালে। সেবছর দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী এরল ব্যারো ব্রিটেনের সাথে ঔপনিবেশিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে মতপ্রকাশ করেন।

এরপর থেকে বিভিন্ন সময় এ নিয়ে আলোচনা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পৃথকীকরণের উদ্যোগ গতি পায়। অবশেষে ২০২০ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী মটলি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন ব্রিটেনের শাসন থেকে বেরিয়ে স্বাধীন, সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র হিসেবে বারবাডোজের অভ্যুদ্দয়ের।

ব্রিটিশ শাসন পরিত্যাগ করলেও কমনওয়েলথ জোটের সদস্য থাকবে বারবাডোজ। যেসব দেশ অতীতে ব্রিটিশ সাম্রাজের অংশ ছিল, তাদের নিয়েই গঠিত কমনওয়েলথ।

১৬২৭ সালে প্রথম ব্রিটেনের অভিবাসীরা বারবাডোজ দ্বীপ দখল করে। এরপর ধীরে ধীরে সেখানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসন প্রতিষ্ঠীত হয়। আফ্রিকা থেকে ক্রীতদাসদের ধরে এনে দ্বীপটিতে চিনি উৎপাদন শিল্প গড়ে তোলে ব্রিটেন।

১৮৩৪ সালে বারবাডোজে ক্রীতদাস প্রথা বিলুপ্ত করা হয়। ১৯৬৬ সালে স্বাধীনতা লাভ করে দেশটি। তবে ব্রিটেনের সাথে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন না করে রাণী এলিজাবেথকেই নিজেদের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গ্রহণ করে স্বাধীন বারবাডোজ। উল্লেখ্য, রাণী এলিজাবেথ কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের আরও বেশ কিছু দেশেরও আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান।

২৮৫,০০০ মানুষের বাস ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র বারবাডোজে। ক্যারিবীয় অঞ্চলের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর একটি এই বারবাডোজ। একইসাথে এই অঞ্চলের সবচেয়ে সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোরও অন্যতম এটি।

একসময় চিনিশিল্প নির্ভর হলেও বর্তমানে পর্যটনসহ আরও বিভিন্ন খাতের ওপর দাড়িয়ে আছে দেশটির অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে খুব একটা আলোচনায় না থাকা বারবাডোজ এবার সংবাদ শিরোনামে উঠে এল বিশ্বের নবীনতম প্রজাতন্ত্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে।