Home আফ্রিকা জিম্বায়ুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে আর নেই

জিম্বায়ুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে আর নেই

রবার্ট মুগাবে (১৯২৪-২০১৯) (Image: Reuters)

মারা গেলেন জিম্বায়ুয়ের ব্যাপক আলোচিত, সমালোচিত সাবেক প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান চরিত্র থেকে পরবর্তীতে স্বৈরশাসকে পরিণত হওয়া মুগাবে ৯৫ বছর বয়সে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

দীর্ঘ ৩৭ বছর কঠোর হাতে দেশ শাসনের পর ২০১৭ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন রবার্ট মুগাবে। তার বেশ ক’বছর আগে থেকেই বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন অসুখে ভুগছিলেন মুগাবে। চলতি বছর এপ্রিলে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয় এই নেতাকে। সেখানেই মারা গেলেন তিনি।

কে ছিলেন রবার্ট মুগাবে?

রবার্ট মুগাবের জন্ম ১৯২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। আজকের জিম্বায়ুয়ে তখন ছিল ব্রিটেনের এক কলোনি, নাম রোডেশিয়া। কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত দেশটি সেসময় শাসন করত সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গরা।

শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ১৯৬৪ সালে গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় এক দশক বিনা বিচারে বন্দী ছিলেন রবার্ট মুগাবে।

১৯৭৩ সালে কারাগারে আটক থাকাকালীন রবার্ট মুগাবেকে সভাপতি নির্বাচিত করে তার দল ‘জিম্বায়ুয়ে আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়ন’। মুগাবে ছিলেন দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

কারাগার থেকে মুক্তিলাভের পর মুগাবে প্রতিবেশী মোজাম্বিকে চলে যান। সেখান থেকে তিনি রোডেশিয়ায় সরকারি স্থাপনা ও বাহিনীর ওপরে গেরিলা আক্রমণ চালাতে শুরু করেন। তবে একইসাথে নিজেদের দাবি নিয়ে বর্ণবাদী সরকারের সাথে আলোচনাও চালিয়ে যান তিনি। একাজে মুগাবে ছিলেন দারুণ দক্ষ।

সফল আলোচনার ধারাবাহিকতায় অবশেষে স্বাধীনতা লাভ করে রোডেশিয়া। নতুন দেশের নতুন নাম হয় ‘জিম্বায়ুয়ে’।

জিম্বায়ুয়ের স্বাধীনতা সংগ্রামে মূখ্য ভূমিকা পালনের সুবাদে ১৯৮০ সালের প্রথম নির্বাচন খুব সহজেই জিতে প্রেসিডেন্টের আসনে বসেন রবার্ট মুগাবে। এরপর ২০১৭ সাল পর্যন্ত একটানা এই পদে থেকে যান মুগাবে।

তার দীর্ঘ চার দশকের শাসনামলে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, স্বাস্থ্য-শিক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে সাফল্য অর্জিত হলেও, ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্বাচনে অনিয়ম, অর্থনীতির বেহাল দশার জন্য দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন রবার্ট মুগাবে।

দেশের ভেতরে অসন্তোষ আর বাইরে আন্তর্জাতিক প্রবল চাপের মুখেও নিরাপত্তাবাহিনীকে ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় টিকে যান রবার্ট মুগাবে। তিনি একবার মন্তব্য করেছিলেন, “একমাত্র ঈশ্বরই তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারবে, আর কেউ নয়।”

কিন্তু গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ২০০৭ সালে ক্ষমতার ওপর নিরঙ্কুশ অধিকার ছাড়তে হয় রবার্ট মুগাবেকে। বিরোধীদলের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে বাধ্য হন তিনি। সমঝোতা মোতাবেক নিজে প্রেসিডেন্টের আসনে থেকে গেলেও প্রতিপক্ষ মরগান চ্যাঙ্গেরাইয়ের জন্য ছেড়ে দিতে হয় প্রধানমন্ত্রীর পদ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বার্ধক্যজনিত কারণে স্বাস্থ্যের গুরুতর অবনতি ঘটে মুগাবের। সেসময় দৃশ্যপটে আসতে শুরু করেন তার স্ত্রী গ্রেস মুগাবে। অসুস্থ রবার্ট মুগাবে তার স্ত্রীকে উত্তরাধিকারী হিসেবে তৈরি করছেন বুঝতে পেরে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় জিম্বায়ুয়ের সেনাবাহিনী, যারাই তাকে গত চার দশক ক্ষমতায় টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল।

সেনাবাহিনীর কঠোর অবস্থানের মুখে ২০১৭ সালে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান রবার্ট মুগাবে। শেষ হয় জিম্বায়ুয়েতে চার দশকের মুগাবে জমানার।

প্রতিবেশীদের প্রতিক্রিয়া

রবার্ট মুগাবের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা তাকে ‘আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আফ্রিকার স্বার্থরক্ষার একজন বিজয়ী’ হিসেবে বর্ণণা করেন। তার ভাষায়, মুগাবের সংগ্রাম বর্ণবাদের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার নিজেদের লড়াইয়েও প্রেরণা জুগিয়েছে।

কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উরুহু কেনিয়াত্তা মন্তব্য করেন, ‘আফ্রিকা মহাদেশের স্বার্থগুলোকে ধারণ করায় বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন রবার্ট মুগাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মুগাবে ছিলেন এমন একজন সাহসী মানুষ, যিনি নিজের বিশ্বাসের জন্য লড়াই করতে কখনও ভয় পেতেননা।’