কাবুল বিমানবন্দরের বাইরে জোড়া আত্মঘাতী বিস্ফোরণ

কাবুল বিমানবন্দরে দেশত্যাগের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে একটি আফগান পরিবার (Image: Reuters)
জোড়া বিস্ফোরণে কেপে উঠল আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল। দেশটির হামিদ কারজাই বিমানবন্দরের প্রবেশমুখে চালানো আত্মঘাতী বোমা হামলায় এখন পর্যন্ত ১৩ মার্কিন সেনা ও ৬০ আফগান নাগরিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে অনুমান।
প্রথম হামলাটির কিছু সময় পরই বিমানবন্দরের অদূরে একটি হোটেলে দ্বিতীয় আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ‘ইসলামিক স্টেট’ (আইএস) কাবুলে চালানো এই জোড়া হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে।
২০০১ সালে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে আল কায়েদার চালানো সন্ত্রাসী হামলার পর এর মূল হোতাদের ধরতে আফগানিস্তানে অভিযানে নামে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনী। তাদের হাতে পতন ঘটে সেখানকার ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারের। এরপর থেকে টানা দু’দশক যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত বেসামরিক সরকার দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছিল আফগানিস্তান।
দীর্ঘ যুদ্ধে ক্লান্ত যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন থেকেই আফগানিস্তানে তাদের মিশন পুরোপুরি শেষ করার কথা জানিয়ে আসছিল। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নেন, যা বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আরও ত্বরান্বিত করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ঠিক হয় আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে আফগানিস্তানের মাটি থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।
এই ঘোষণা আসতেই তৎপর হয়ে ওঠে আফগানিস্তানে স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী তালেবান গোষ্ঠী। মার্কিন বাহিনীর বিদায়ের মধ্যেই একের পর এক প্রদেশ দখল করতে শুরু করে তারা। ১৫ আগস্ট তাদের হাতে রাজধানী কাবুলের পতনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দু’দশক পর আবারও আফঘানিস্তানের ক্ষমতায় ফেরে তালেবানরা।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত চলা কট্টর তালেবান শাসনের তিক্ত অভিজ্ঞতার স্মৃতি স্মরণ করে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সাধারণ আফগানরা। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎের আশঙ্কায় তারা দলে দলে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে থাকা আফগান নাগরিকরা পাকিস্তান, ইরানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে চলে যেতে শুরু করে। আর রাজধানী কাবুলের বাসিন্দারা ভিড় করতে থাকেন বিমানবন্দরে।
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন বাহিনীও দেশ ছাড়তে চাওয়া আফগানদের সহায়তার উদ্যোগ নিলে বিমানবন্দর অভিমুখে আফগান নাগরিকদের ভিড় আরও বাড়তে থাকে।
এরই মধ্যে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিমানবন্দর লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারে সতর্কতা জারি করে। কিন্তু তা স্বত্তেও বিমানবন্দরে দেশ ছাড়তে মরিয়া আফগানদের ঢল অব্যাহত থাকে।
অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে বিমানবন্দরের প্রবেশমুখগুলোতে চেকপোস্ট বসিয়েছিল মার্কিন বাহিনী। এমনই একটি প্রবেশপথ, যেটির নাম ‘আবে গেট’, সেখানে ভিড়ের মধ্যে আজ মিশে যায় আল কায়েদার এক আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজের শরীরে রাখা বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ ঘটায় সে। মূহুর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তারসহ আশেপাশের সকলের দেহ। ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিক মারা যায় কয়েক ডজন মানুষ। আহতের দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানেও মারা যায় অনেকে।
এই হামলার কিছু সময়ের মধ্যেই দ্বিতীয় আত্মঘাতী হামলাটি চালানো হয় কাছের ব্যারন হোটেলে। আফগানিস্তানে অবস্থানরত ব্রিটিশ ও মার্কিন নাগরিক এবং দেশত্যাগে ইচ্ছুক আফগানদের এই হোটেলেই জড়ো হতে বলেছিল কর্তৃপক্ষ। ধারণা করা হচ্ছে, একারণেই হামলার জন্য এই হোটেলটিকেও টার্গেট করে আল কায়েদা।
আজকের জোড়া বিস্ফোরণে ১৩ মার্কিন সেনা ও ৬০ আফগান নাগরিক নিহত হওয়ার পাশাপাশি আরও ১৮ মার্কিনী ও প্রায় ১৪০ আফগান আহত হয়েছেন।
আত্মঘাতী বোমা হামলার প্রতিক্রিয়ায় হোয়াইট হাউজ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন হামলাকারীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, “আমরা ভূলেও যাবনা, ক্ষমাও করবনা। আমরা তোমাদের খুজে বার করব এবং এর মূল্য পরিশোধ করাব।”