সাবেক ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজির এক বছরের কারাদন্ড

কারাদন্ডে দন্ডিত সাবেক ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি (Image: Reuters)

আর্থিক অনিয়মের মামলায় এক বছরের কারাদন্ড হল ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজির। ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় অনৈতিক আর্থিক তৎপরতার অভিযোগ ছিল তার বিরূদ্ধে।

২০০৭ সালের নির্বাচনে জিতে ২০১২ সাল পর্যন্ত এক মেয়াদে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন সারকোজি। দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও অংশ নেন তিনি। কিন্তু ফ্রাসোয়া ওলাদের কাছে পরাজিত হন সারকোজি।

ঐ নির্বাচনে নিজের তহবিলের জন্য নির্ধারিত সীমার চেয়েও কয়েক মিলিয়ন ইউরো বেশি খরচ করেছিলেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছিল নিকোলাস সারকোজির বিরুদ্ধে।

সেই মামলাতেই সারকোজিকে দোষী সাব্যস্ত করে প্যারিসের একটি আদালত। আজ দেওয়া রায়ে সেই অপরাধের সাজা হিসেবে এক বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয় সাবেক এই ফরাসি প্রেসিডেন্টকে।

তবে আদালতের আরেক নির্দেশনা অনুযায়ী, সারকোজি চাইলে কারাগারে না গিয়ে নিজের বাড়িতেই গৃহবন্দী অবস্থায় কারাদন্ড ভোগ করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে সারকোজিকে সাজার পুরো মেয়াদ জুড়ে বিশেষ ইলেকট্রনিক ব্রেসলেট পড়িয়ে রাখা হবে।

এই ধরনের ব্রেসলেট কারও শরীরে বাধা থাকলে তিনি আগে থেকে নির্ধারণ করে রাখা নির্দিষ্ট জায়গার বাইরে পা রাখলেই কর্তৃপক্ষের কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই সংবাদ চলে যায়। কারাগারে থাকতে অক্ষম কিংবা গুরুতর অসুস্থ কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের কারাগারে না পাঠিয়েও কারাভোগ নিশ্চিত করতে এই যন্ত্রের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আবার সারকোজির মত ভিভিআইপি বন্দিদের ক্ষেত্রেও অনেক সময় তাদের সামাজিক মর্যাদা কিংবা নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে এভাবে শাস্তি কার্যকরের নির্দেশ দেয় আদালত।

নিকোলাস সারকোজি তার বিরুদ্ধে আনা বেআইনিভাবে অর্থ ব্যয়ের সকল অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তিনি একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে দাবি করে আসছেন।

তবে সারকোজির বিরুদ্ধে আরও অনেক মামলা যেমন বিচারাধীন রয়েছে, তেমনি এবছর মার্চে আরেক মামলায়ও তাকে এক বছরের কারাদন্ড দিয়েছিল আদালত। সেই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে সারকোজির করা আপিল প্রক্রিয়াধীন থাকায় কারাভোগ থেকে সাময়িকভাবে রেহাই পান তিনি।

এবারের মামলার প্রেক্ষাপটটি ‘বেগম্যালিয়ন কেলেংকারি’ নামে পরিচিত। সারকোজি ছাড়াও আরও ১৩ জন ব্যক্তি ঐ ঘটনায় অভিযুক্ত। নিকোলাস সারকোজির রাজনৈতিক দল ‘ইউএমপি’ ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার পক্ষে প্রচারণায় প্রায় ২২.৫ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে। এই অর্থ ফ্রান্সের নির্বাচনী বিধিমালায় কোন প্রার্থীর জন্য ব্যয় করার সর্বোচ্চ বরাদ্দ সীমারও প্রায় দ্বিগুণ।

শুধু তাই নয়, এই অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ‘বেগম্যালিয়ন’ নামের একটি পেশাদার সংস্থাকে ভাড়া করে অভিযুক্তরা। ঐ সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় নির্বাচনী প্রচারণায় সংঘটিত অতিরিক্ত সেই ব্যয়কে আনুষ্ঠানিক নথিপত্রে প্রার্থীর খরচ হিসেবে উল্লেখ না করে দলের খরচ হিসেবে দেখানোর, যাতে নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের দায় কৌশলে এড়ানো যায়।

নিকোলাস সারকোজির আইনজীবিরা মামলার শুনানির সময় দাবি করে আসছিলেন যে তাদের মক্কেল এসব অনিয়মের ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। এই দাবি খারিজ করে দিয়ে আদালত বলেন, হতে পারে বেগম্যালিয়ন-কে দিয়ে অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার ঘটনাটির পুরোটা সাবেক প্রেসিডেন্ট জানতেন না, কিন্তু তার শিবিরের নির্বাচনী খরচ যে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে গেছে সেটি তার নজর এড়ানোর কথা নয় এবং সেই অবস্থাতেও তিনি কোন পদক্ষেপ নেননি!

২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা নিকোলাস সারকোজি কঠোর অভিবাসন বিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার সময়ে উদ্ভূত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার দিনগুলোতে ফ্রান্সের অর্থনীতিকে শক্তিশালী রাখতে একাধিক সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন তিনি।

বিপরীতে সমালোচকদের দৃষ্টিতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার আচরণ ছিল পূর্বতন অন্যান্য ফরাসি প্রেসিডেন্টদের তুলনায় অতিসক্রিয় এবং চাকচিক্যময়। তার এই ‘বর্নিল’ ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হয় প্রেসিডেন্ট থাকাকালীনই ২০০৮ সালে মডেল ও গায়িকা কার্লা ব্রুনিকে বিয়ের কারণে।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে নানা কারণে আলোচিত হলেও জনমনে খুব একটা স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি নিকোলাস সারকোজি। ফলে ২০১২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাড়ালেও ফরাসি ভোটাররা নিরাশ করেন তাকে। ২০১৭ সালের নির্বাচনে আবারও অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেন সারকোজি। কিন্তু সেবার দলীয় মনোনয়ন পেতেও ব্যর্থ হন বর্তমানে ৬৬ বছর বয়সী এই নেতা।