এবার ব্রিটেন ও কানাডাও বর্জন করবে বেইজিং অলিম্পিক

(Image: Reuters)

যুক্তরাষ্ট্রের পর এবার বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন শীতকালীন অলিম্পিক কূটনৈতিকভাবে বর্জনের ঘোষণা দিল ব্রিটেন ও কানাডাও।

সপ্তাহখানেক আগে চীনে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিশেষ করে উইঘুর সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়নের প্রতিবাদে বেইজিং অলিম্পিকে কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

এর পরপরই একই রকম ঘোষণা দেয় অস্ট্রেলিয়াও। এবার একই পথে হাটল চীন ইস্যুতে সমমনোভাবাপন্ন আরও দুই দেশ ব্রিটেন ও কানাডা।

বুধবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন জানিয়েছেন, দেশটির কোন মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ কর্তা বেইজিং অলিম্পিকের কোন অনুষ্ঠানে অংশ নেবেননা। এর কয়েক ঘন্টা পর কানাডাও জানিয়ে দেয় তাদের দেশও কূটনীতিক পাঠাবেনা শীতকালীন অলিম্পিকের এই আসরে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্জনের ঘোষণার পরপরই তীব্র ভাষায় তাদের এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছিল চীন। তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সকল অভিযোগ অস্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেয়। যদিও তা কি হতে পারে সে বিষয়ে কিছু জানায়নি বেইজিং।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত প্রশ্নোত্তর পর্বে বরিস জনসন কূটনৈতিক বয়কটের সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করে জানান, ব্রিটিশ ক্রীড়াবিদরা গেমসে অংশ নেবেন, কিন্তু কূটনীতিকরা যাবেননা। এমন অবস্থানের ব্যাখ্যা করে বরিস বলেন, তিনি ‘খেলাধূলা বর্জন’ করাকে সমর্থন করেননা।

অন্যদিকে কানাডার রাজধানী অটোয়ায় সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বলেছেন, তারা বিগত কয়েক বছর ধরেই চীনে সংঘটিত মানবাধিকার হরণের ঘটনাগুলো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। এই কূটনৈতিক বর্জন তারই বহিঃপ্রকাশ। তবে প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো এও মন্তব্য করেন, তিনি মনে করেননা তার দেশের এই বয়কট চীনকে অবাক করবে।

পরপর একাধিক দেশের কূটনৈতিক বয়কটের এমন ঘটনায় অসন্তোষ জানালেও ‘আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি’ (আইওসি)-র প্রেসিডেন্ট থমাস ব্যাচ বলেছেন, যদিও রাজনৈতিক বয়কটের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে, কিন্তু বর্জনকারী দেশগুলোর খেলোয়াড়রা যে গেমসে অংশগ্রহণ করবেন, এটাই আনন্দের বিষয়।

এদিকে চীনের প্রতিবেশী দেশ জাপানও শীতকালীন অলিম্পিকে কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল না পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে।

নিউজিল্যান্ডও একই রকম সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে শোনা গেলেও তারা রাজনৈতিক ইস্যুতে নয়, বরং করোনা পরিস্থিতির কারণে বেইজিংয়ে কূটনীতিকদের পাঠানো থেকে বিরত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে। অবশ্য চীনের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নিউজিল্যান্ডও বরাবরই সোচ্চার।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুধু উইঘুর বা মানবাধিকার লঙ্ঘনই নয়, আরও বিভিন্ন ইস্যুতেও পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে উত্তেজনা তীব্র হচ্ছে চীনের। কখনো বাণিজ্য, কখনো সাইবার আক্রমণ, কখনো হংকং কিংবা তাইওয়ান নিয়ে বেইজিংয়ের হুংকার, কখনওবা দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক তৎপরতাকে কেন্দ্র করে কয়েকদিন পরপরই পশ্চিমা কোনো না কোনো দেশের সাথে বিতন্ডায় জড়িয়েছে চীন।

যুক্তরাষ্ট্র স্যাটেলাইট চিত্রসহ বিভিন্ন ‘প্রমাণ’ উপস্থাপন করে দাবি করে আসছে, প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সরকার চীনের পশ্চিমাংশের জিনজিয়াং প্রদেশে বসবাসরত উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়কে বন্দিশিবিরে পাঠিয়ে তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য থেকে তাদেরকে স্থায়ীভাবে বিচ্যুত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি উইঘুর পরিবারগুলো থেকে শিশু-কিশোরদের আলাদা করে ফেলার মত ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ ওয়াশিংটনের। চীন যথারীতি এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে আসছে।

কানাডার সাথে চীনের সম্পর্কের সাম্প্রতিক অবনতির সূত্রপাত ২০১৮ সালে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘হুয়াই’-র এক শীর্ষকর্তার গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে। কানাডা সেদেশে অবস্থানরত ঐ নারী আধিকারিককে আটক করলে চীন তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে তাদের দেশে থাকা দুই কানাডীয় নাগরিককে গ্রেফতার করে। পরে অবশ্য দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার ভিত্তিতে তিনজনই মুক্তি পেয়ে নিজ নিজ দেশে ফিরে যান।

অস্ট্রেলিয়ার সাথে চীনের সম্পর্ক কিছুদিন আগ পর্যন্তও বেশ হৃদ্যতাপূর্ণ ছিল। দু’দেশের মধ্যে চলমান উল্লেখযোগ্য পরিমান বাণিজ্যের কারণে অস্ট্রেলিয়াকে চীনের সমালোচনা খুব একটা করতে দেখা যেতনা।

কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্রসীমার অদূরেই দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের আগ্রাসী সামরিক তৎপরতা সতর্ক অবস্থানে নিয়ে যায় দেশটিকে। চীনের এমন তৎপরতাকে এখন নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হিসেবে দেখছে অস্ট্রেলিয়া।

এদিকে একের পর এক পশ্চিমা দেশ কূটনৈতিকভাবে বেইজিং অলিম্পিক বর্জনের ডাক দিলেও ভিন্নমতও পাওয়া যাচ্ছে এই ইস্যুতে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানূয়েল ম্যাক্রো বলেছেন, অলিম্পিক বয়কট করা কোন কার্যকরী ফল বয়ে আনবে না, এটাই কেবলই প্রতীকী একটা সিদ্ধান্ত হয়ে থাকবে।

তিনি আরও বলেন, অলিম্পিকের রাজনীতিকরণ করা ঠিক হবেনা। আর বয়কট করলে পুরোপুরি করা উচিৎ। হয় কূটনীতিকদের সাথে সাথে ক্রীড়াবিদদেরও না পাঠানো হোক, নাহলে এসবের পরিবর্তে এমন কোন পদক্ষেপ নেওয়া হোক যা (চীনের মানবাধিকার) পরিস্থিতির বাস্তবিকই উন্নতি ঘটাতে পারবে।

অন্যদিকে বয়কটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতারেসও জানিয়েছেন, অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য চীনের আমন্ত্রণ তিনি পেয়েছেন এবং তিনি এতে যোগ দেবেন।