সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। যুদ্ধাপরাধ, হত্যা, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দেওয়া এই রায় সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর বিচারপ্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে রায়টি অনুপস্থিতিতে (in absentia) দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আদালতে উপস্থিত ছিলেন না আসাদ।
আসাদের পাশাপাশি তার ছোট ভাই মাহের আল-আসাদকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় আসাদের চাচাতো ভাই ও দারা প্রদেশের সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা আতেফ নাজিবও মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। নাজিব আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
পতনের পর প্রথম বড় আইনি শাস্তি
২০০০ সালে বাবার মৃত্যুর পর সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন বাশার আল-আসাদ। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালের শেষ দিকে বিদ্রোহীদের দ্রুত অভিযানের মুখে তার সরকারের পতন ঘটে। এরপর তিনি সিরিয়া ছেড়ে রাশিয়ায় চলে যান এবং সেখানে আশ্রয় পান।
ক্ষমতা হারানোর পর এই প্রথম সিরিয়ার কোনো আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে আসাদকে দোষী সাব্যস্ত করে। ফলে রায়টি শুধু একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং আসাদ পরিবারের দীর্ঘ শাসনামলের কর্মকাণ্ডের বিচার নিয়ে সিরিয়ার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
কী অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড?
আদালতের রায়ে আসাদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, নির্বিচারে গ্রেপ্তার এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। ২০১১ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর দেশটিতে যে সহিংস সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, তা প্রায় ১৪ বছর ধরে চলে। ওই সংঘাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হন এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়ন, আটক ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতন এবং বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতার অভিযোগ বহু বছর ধরে আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাও তার সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে।
রাশিয়ায় থাকা আসাদের কী হবে?
রায়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে কীভাবে?
আসাদ বর্তমানে রাশিয়ায় অবস্থান করছেন। ফলে সিরিয়ার আদালতের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের জন্য তাকে সিরিয়ার হাতে তুলে দেওয়া প্রয়োজন হবে। কিন্তু রাশিয়া তাকে আশ্রয় দেওয়ায় আসাদকে দ্রুত সিরিয়ায় ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে।
এ কারণেই কিছু বিশ্লেষক রায়টিকে প্রতীকী বা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জটিল বলে মনে করছেন। অন্যদিকে সিরিয়ার ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে এই রায় দীর্ঘদিনের বিচারপ্রত্যাশার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
রায় ঘিরে সিরিয়ায় প্রতিক্রিয়া
রায় ঘোষণার পর দামেস্ক ও দারাসহ সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় মানুষকে উদযাপন করতে দেখা গেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। অনেকেই সংঘাতে নিহত স্বজনদের ছবি নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন।
তবে এই রায় সিরিয়ার বিচার ও পুনর্মিলন প্রক্রিয়ায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ আসাদ সরকারের পতনের পর দেশটি এখনও রাজনৈতিক পুনর্গঠন, নিরাপত্তা এবং অতীতের অপরাধের জবাবদিহির মতো কঠিন বিষয়গুলোর মুখোমুখি।
বাশার আল-আসাদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের এই রায় তাই শুধু একজন সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে আদালতের সিদ্ধান্ত নয়—এটি সিরিয়ার রক্তক্ষয়ী অতীতের বিচার, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচারের দাবি এবং দেশটির নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় একটি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
