যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক সামরিক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো নতুন করে গড়ে তুলছে ইরান। শুধু পুরোনো অবকাঠামো মেরামত নয়, দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনাগুলোতে নতুন নির্মাণকাজও শুরু হয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে অন্তত দুটি বড় ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং আরও ১২টি সামরিক স্থাপনায় নির্মাণ, খনন ও সংস্কারের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে নতুন হামলা মোকাবিলায় নিজেদের সামরিক অবকাঠামো আরও সুরক্ষিত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে তেহরান। একই সঙ্গে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের কাজও জোরদার করেছে দেশটি।
৬ নভেম্বর প্রকাশিত স্যাটেলাইট চিত্রের বিশ্লেষণে ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে নতুন তৎপরতার বিষয়টি সামনে এসেছে। বিশেষ করে রাজধানী তেহরানের কাছের গার্মদারেহ এবং দেশটির উত্তরাঞ্চলের শাহরুদ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে বড় ধরনের নির্মাণকাজের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান এমএআইএআর স্যাটেলাইট চিত্র পর্যালোচনা করে এসব পরিবর্তন শনাক্ত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের পাশাপাশি নতুন স্থাপনা তৈরির কাজও চলছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে নতুন নির্মাণকাজ
গার্মদারেহ সামরিক ঘাঁটিটি ইরানের রাজধানী তেহরানের কাছাকাছি কারাজ এলাকায় অবস্থিত। এটি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোর একটি অংশ। স্যাটেলাইট চিত্রে সেখানে মাটি খনন, নতুন নির্মাণকাজ এবং বিভিন্ন স্থানে অবকাঠামোগত পরিবর্তনের চিহ্ন দেখা গেছে।
উত্তরাঞ্চলের শাহরুদ ঘাঁটিতেও একই ধরনের তৎপরতা শনাক্ত হয়েছে। সেখানে নতুন স্থাপনা তৈরির পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।
সামরিক ঘাঁটির আশপাশে খননকাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হতে পারে স্থাপনাগুলোকে আরও সুরক্ষিত করা। ভূগর্ভস্থ কক্ষ, শক্তিশালী আশ্রয়কেন্দ্র এবং বিকল্প প্রবেশপথ তৈরি করা হলে বিমান হামলায় সামরিক সরঞ্জাম ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি কমানো সম্ভব।
তবে স্যাটেলাইট চিত্রে নির্মাণকাজ দেখা গেলেও প্রতিটি স্থাপনার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিশ্চিত করা যায়নি।
আরও ১২টি সামরিক স্থাপনায় সংস্কারের চিহ্ন
শুধু দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি নয়, ইরানের আরও অন্তত ১২টি সামরিক স্থাপনায় সংস্কার ও পুনর্গঠনের কাজ চলছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
পশ্চিমাঞ্চলের কেরমানশাহ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর ছাদ নতুন করে তৈরি করার চিহ্ন পাওয়া গেছে। অন্যদিকে তেহরানের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ফেলার কাজ চলছে।
পারচিন ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক গবেষণা ও উৎপাদন অবকাঠামোর একটি অংশ। অতীতেও এই স্থাপনা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। ফলে সেখানে নতুন নির্মাণ ও সংস্কারের বিষয়টি বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া কয়েকটি বিমানঘাঁটি এবং ক্ষেপণাস্ত্র সংশ্লিষ্ট স্থাপনাতেও মেরামতের কাজ শনাক্ত হয়েছে। এসব পরিবর্তন থেকে বোঝা যায়, ইরান সামরিক অবকাঠামো পুনরুদ্ধারে একাধিক এলাকায় একযোগে কাজ করছে।
ভবিষ্যৎ হামলা ঠেকাতে কি বদলাচ্ছে সামরিক কৌশল?
ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে নতুন নির্মাণকাজের পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে আরও সুরক্ষিত করা। দ্বিতীয়ত, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা।
আধুনিক যুদ্ধে শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বা সামরিক সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা যায় না। প্রতিপক্ষের বিমান হামলা থেকে অস্ত্রভান্ডার, যোগাযোগব্যবস্থা এবং কমান্ড সেন্টার রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে অনেক দেশ সামরিক স্থাপনার একটি অংশ মাটির নিচে তৈরি করে। ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ব্যবহার করলে স্যাটেলাইট থেকে সেগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা গেলেও সরাসরি আঘাত করে পুরো অবকাঠামো ধ্বংস করা তুলনামূলক কঠিন হতে পারে।
ইরানও দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা এবং সুরক্ষিত সামরিক অবকাঠামো তৈরির কৌশল অনুসরণ করছে। সাম্প্রতিক নির্মাণকাজ সেই কৌশল আরও বিস্তৃত করার অংশ হতে পারে।
সামরিক পুনর্গঠন বনাম অর্থনৈতিক সংকট
ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যে সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের ব্যয় কীভাবে বহন করবে দেশটি। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি রপ্তানিতে বাধা এবং যুদ্ধের কারণে অর্থনীতিতে ইতিমধ্যে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
দেশটির সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বৃদ্ধির মতো সমস্যার মুখোমুখি। এমন পরিস্থিতিতে সরকার সামরিক স্থাপনা পুনর্গঠনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছে।
বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, এই অগ্রাধিকার থেকে বোঝা যায়, ইরানের নেতৃত্ব আপাতত সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক পুনর্বাসন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নও দেশটির জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ
ইরানের সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের খবর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিকল্পনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো দেশের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ক্ষয়ক্ষতি করাই দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার নিশ্চয়তা দেয় না।
ইরান যদি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো মেরামত করতে পারে এবং আরও সুরক্ষিত বিকল্প অবকাঠামো তৈরি করে, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের হামলার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও সামরিক কমান্ড অবকাঠামোর পুনর্গঠন আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। নতুন করে এই সক্ষমতা পুনর্গঠিত হলে আঞ্চলিক সামরিক হিসাবেও পরিবর্তন আসতে পারে।
যুদ্ধের বিরতি নাকি নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি?
ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে নির্মাণকাজের সময়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরুর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। এমনকি কেশম দ্বীপে নতুন মার্কিন হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের নির্মাণকাজকে কেবল স্বাভাবিক অবকাঠামো সংস্কার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আবার শুধু স্যাটেলাইট চিত্রের ভিত্তিতে দেশটি নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরান ভবিষ্যতে একই ধরনের হামলায় যাতে সামরিক সক্ষমতা দ্রুত হারিয়ে না ফেলে, সে জন্য অবকাঠামো পুনর্গঠনে মনোযোগ দিচ্ছে। সামরিক ঘাঁটিগুলো আরও সুরক্ষিত করা এবং বিকল্প স্থাপনা তৈরি করা সেই প্রস্তুতির অংশ হতে পারে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা চললেও ইরান তার সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের কাজ থামাচ্ছে না। এই পুনর্গঠন শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ঝুঁকি কমাবে, নাকি ভবিষ্যতের সংঘাতে দেশটিকে আরও প্রস্তুত করে তুলবে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের আঞ্চলিক পরিস্থিতির ওপর।
