সোমালিয়ায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিরোধ এবার নতুন মোড় নিয়েছে। দেশটির সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদের মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আরও এক বছর ক্ষমতায় থাকার যে যুক্তি সরকার তুলে ধরেছিল, তা প্রত্যাখ্যান করেছেন আদালত। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায়ে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের কথাও বলা হয়েছে। আদালতের এই সিদ্ধান্তে দেশটির রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দেওয়া এই রায়ের এক দিন আগে প্রেসিডেন্ট প্রধান বিচারপতি বাশে ইউসুফ আহমেদকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই সিদ্ধান্তও অসাংবিধানিক বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে এখন মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
কেন মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধ
সোমালিয়ার সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের মেয়াদ ছিল চার বছর। কিন্তু সম্প্রতি পার্লামেন্টে সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে মেয়াদ চার বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রেসিডেন্টের সমর্থকেরা যুক্তি দেন, এই সংশোধনের ফলে বর্তমান সরকারও অতিরিক্ত এক বছর দায়িত্ব পালন করতে পারবে। সে অনুযায়ী ২০২৭ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার অবস্থান নেয় প্রেসিডেন্টের পক্ষ।
তবে বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা শুরু থেকেই এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে আসছিলেন। তাঁদের বক্তব্য, সংবিধানের সংশোধন ভবিষ্যতের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্য কার্যকর হতে পারে, কিন্তু বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ানোর সুযোগ নেই। তাঁদের মতে, নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ক্ষমতায় থাকা গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক নীতির পরিপন্থী।
সুপ্রিম কোর্টও বিরোধীদের যুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ, পার্লামেন্টের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বর্তমান পদাধিকারীদের ক্ষমতায় থাকার সময়সীমা বাড়িয়ে দেয় না। ফলে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের বর্তমান মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।
নির্বাচনের জন্য সময় বেঁধে দিল আদালত
রায়ে রাজনৈতিক নেতাদের আগামী ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের পদ্ধতি ও আয়োজন নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপর ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত সরকারকে কেবল দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বড় ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত বা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা সরকারের থাকবে না।
তবে রায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা হয়নি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন না হলে কে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন, কিংবা ক্ষমতার শূন্যতা কীভাবে পূরণ হবে—সে বিষয়ে আদালত কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশ দেননি। এই অস্পষ্টতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
প্রেসিডেন্টের কার্যালয় রায়ের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। ফলে সরকার আদালতের নির্দেশ মেনে নেবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
প্রধান বিচারপতিকে সরানোর চেষ্টা ঘিরে নতুন বিতর্ক
সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার ঠিক আগের দিন প্রধান বিচারপতি বাশে ইউসুফ আহমেদকে অপসারণের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট। তাঁর কার্যালয়ের বক্তব্য ছিল, বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রমে সমস্যা এবং বিচারব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজন থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, প্রধান বিচারপতিকে সরানোর ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। আদালতের অভিযোগ, মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে বিচারিক পর্যালোচনা বাধাগ্রস্ত করতেই প্রধান বিচারপতিকে অপসারণের চেষ্টা করা হয়েছিল।
এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান সোমালিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে সরকার সহযোগিতা না করলে সাংবিধানিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
নির্বাচন পদ্ধতি নিয়েও বিরোধ
সোমালিয়ার রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রে শুধু প্রেসিডেন্টের মেয়াদ নয়, নির্বাচন কীভাবে হবে—সেই প্রশ্নও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদ সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বর্তমানে দেশটিতে গোত্রভিত্তিক প্রতিনিধিরা আইনপ্রণেতা নির্বাচন করেন এবং পরে আইনপ্রণেতারা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন।
প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনায় সাধারণ ভোটারদের সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু বিরোধী দল এবং পুন্তল্যান্ড ও জুবাল্যান্ডের মতো আঞ্চলিক প্রশাসন এই পরিবর্তনের পদ্ধতি ও সময় নিয়ে আপত্তি তুলেছে। তাঁদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া নির্বাচনব্যবস্থা বদলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই বিরোধের ফলে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার অভাবও বেড়েছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি সংকটকে আরও জটিল করছে
সোমালিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে নিরাপত্তা পরিস্থিতিও জড়িয়ে আছে। রাজধানী মোগাদিসুতে রাজনৈতিক বিরোধ ঘিরে সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে জাতিসংঘের রাজনৈতিক মিশন দেশটিতে কার্যক্রম বন্ধ করেছে। ওই মিশন দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতা করছিল। এখন নতুন কোনো মধ্যস্থতাকারী নিয়ে ঐকমত্য হয়নি।
এর পাশাপাশি আল-শাবাব জঙ্গিগোষ্ঠী দেশের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটির গ্রামীণ অঞ্চলের বড় অংশে গোষ্ঠীটির প্রভাব রয়েছে। আফ্রিকান ইউনিয়নের নিরাপত্তা মিশন ও উগান্ডার সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনাও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
রায় কার্যকর হবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন
সুপ্রিম কোর্টের রায় সোমালিয়ার রাজনৈতিক সংকট নিরসনে একটি সাংবিধানিক পথ দেখালেও বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন অনিশ্চিত। আবার আদালতের নির্দেশ অমান্য করা হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সংঘাত আরও বাড়তে পারে।
এখন সবচেয়ে জরুরি হলো রাজনৈতিক পক্ষগুলোর আলোচনায় ফেরা এবং নির্বাচনের বিষয়ে গ্রহণযোগ্য সমঝোতা তৈরি করা। কারণ ক্ষমতার বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে শুধু সরকার পরিচালনা নয়, জঙ্গিবাদ মোকাবিলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সোমালিয়ার সামনে তাই এখন বড় পরীক্ষা—সাংবিধানিক রায়কে সংঘাতের নতুন কারণ না বানিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগোনো।
