ইবোলার সংক্রমণে বিপর্যস্ত মধ্য আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের পূর্বাঞ্চলে এবার ভয়াবহ সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। উত্তর কিভু প্রদেশের কান্তিনে গ্রামে রাতভর হামলা চালিয়ে অন্তত ৩৩ জনকে হত্যা করেছে বন্দুকধারীরা। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ৫০টির বেশি বাড়িঘর। হামলার মুখে স্থানীয় হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন প্রায় ১৮০ রোগী। তাঁদের মধ্যে ইবোলায় আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীও রয়েছেন। ফলে একদিকে প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা, অন্যদিকে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা হামলার জন্য ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে সম্পর্কিত সশস্ত্র গোষ্ঠী অ্যালাইড ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস বা এডিএফকে দায়ী করেছেন। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারাও হামলায় এডিএফ যোদ্ধাদের জড়িত থাকার কথা জানিয়েছেন। তবে হামলার পূর্ণাঙ্গ চিত্র এবং নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
রাতের আঁধারে গ্রামে হামলা
উত্তর কিভু প্রদেশের বেনি শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে কান্তিনে গ্রামটির অবস্থান। বৃহস্পতিবার রাতে সেখানে হামলা চালায় সশস্ত্র ব্যক্তিরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্দুকধারীরা বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়, লুটপাট চালায় এবং সাধারণ মানুষের ওপর হামলা করে।
স্থানীয় নাগরিক সমাজের নেতা জাস্টিন পালুকু জানিয়েছেন, হামলার পর তাঁরা অন্তত ৩৩টি মরদেহ গুনেছেন। ৫০টির বেশি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্য একটি স্থানীয় সূত্রও নিহতের সংখ্যা ৩৩ বলে নিশ্চিত করেছে। অধিকাংশ মানুষ গুলিতে নিহত হয়েছেন। কারও কারও শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল, আবার কয়েকজনকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
হামলার পর বহু মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানের সন্ধানে পালিয়ে যান। তাঁদের অনেকেই আশপাশের এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন। স্থানীয় নেতারা বলছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও হামলাকারীরা কীভাবে গ্রামে ঢুকে এত বড় হত্যাযজ্ঞ চালাতে পারল, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
হাসপাতাল থেকে পালালেন ১৮০ রোগী
হামলার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এটি এমন একটি এলাকায় ঘটেছে যেখানে ইবোলার সংক্রমণ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ করছেন। কান্তিনের কেলেকেলে হাসপাতাল কেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় গুলির শব্দ শোনা যায় এবং হাসপাতাল থেকে মাত্র ৫০ মিটারের মতো দূরে বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়।
নিরাপত্তাহীনতার কারণে হাসপাতালটির প্রায় ১৮০ রোগীকে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ইবোলায় আক্রান্ত একজন নিশ্চিত রোগী এবং আরও কয়েকজন সন্দেহভাজন রোগী রয়েছেন। হাসপাতালের চিকিৎসা পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান কাকুলে জানিয়েছেন, পর্যবেক্ষণে থাকা উচ্চঝুঁকির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিরাও পালিয়ে গেছেন।
স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্বেগ, রোগী ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের বাইরে চলে গেলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে। তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করা না গেলে সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা অন্যদেরও আলাদা রাখা সম্ভব হবে না। এতে রোগটি নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ইবোলার সঙ্গে লড়াইয়ে নতুন বাধা
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের পূর্বাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে ইবোলার সংক্রমণ মোকাবিলা করছে। উত্তর কিভু প্রদেশ এই প্রাদুর্ভাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এবারের প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী বিরল বান্দিবুগিও ভাইরাস। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সংক্রমণ শনাক্ত, রোগীদের চিকিৎসা এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণে কাজ করছে।
কিন্তু সশস্ত্র সংঘাতের কারণে এসব কার্যক্রম বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কোনো এলাকায় হামলা হলে চিকিৎসাকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়, স্বাস্থ্যকর্মীদের চলাচল সীমিত হয় এবং রোগীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও আলাদা রাখার কাজও ব্যাহত হয়।
এডিএফের হামলার কারণে কান্তিনে ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা এখন নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য—দুই সংকটের মুখে পড়েছেন। যারা পালিয়ে গেছেন, তাঁদের মধ্যে ইবোলার উপসর্গ থাকা কেউ থাকলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ আরও জটিল হতে পারে।
এডিএফ কারা
অ্যালাইড ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস বা এডিএফের শিকড় প্রতিবেশী উগান্ডায়। গোষ্ঠীটি দীর্ঘদিন ধরে উগান্ডা ও কঙ্গোর সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয়। ২০১৯ সালে তারা ইসলামিক স্টেটের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে। এরপর ইসলামিক স্টেটের মধ্য আফ্রিকাভিত্তিক শাখার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও দৃশ্যমান হয়।
এডিএফের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা, অপহরণ, গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া এবং হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে সক্রিয় প্রায় এক শ সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে এডিএফ অন্যতম। একই অঞ্চলে রুয়ান্ডার সমর্থনপুষ্ট এম২৩ বিদ্রোহীরাও সক্রিয়। এম২৩ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ফলে অঞ্চলটিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে পূর্ব কঙ্গোতে এডিএফের হামলায় ৬৬ জন নিহত হয়েছিলেন। জাতিসংঘ ওই হত্যাকাণ্ডকে ভয়াবহ গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছিল। সাম্প্রতিক কান্তিনে হামলা আবারও দেখিয়ে দিল, বেসামরিক মানুষ এখনো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রধান লক্ষ্য হয়ে রয়েছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
হামলার পর স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, এলাকায় সরকারি বাহিনী ও নিরাপত্তাকর্মীর উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও হামলাকারীরা কীভাবে এত সহজে গ্রামে ঢুকে বাড়িঘর পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করল, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
পূর্ব কঙ্গোতে দীর্ঘদিন ধরে সেনা অভিযান ও নিরাপত্তা তৎপরতা চললেও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা বন্ধ করা যায়নি। দুর্গম ভূপ্রকৃতি, সীমান্তবর্তী এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর চলাচল এবং বিভিন্ন বিদ্রোহী সংগঠনের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার নিশ্চয়তা। একই সঙ্গে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যাওয়া রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং তাঁদের চিকিৎসার আওতায় ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।
একসঙ্গে দুই সংকট মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ
কান্তিনের হামলা কঙ্গোর সামনে দুটি বড় সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে। একদিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে ইবোলার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখতে হবে। এই দুই কাজের কোনো একটিতে ব্যর্থতা অন্য সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
ইবোলা মোকাবিলায় শুধু হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র চালু রাখলেই হবে না; রোগীদের নিরাপদ যাতায়াত, স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা মানুষের পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সশস্ত্র হামলা বন্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি প্রয়োজন।
কান্তিনের ৩৩টি প্রাণহানি তাই শুধু আরেকটি বিদ্রোহী হামলার ঘটনা নয়। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় জনস্বাস্থ্য সংকট কত দ্রুত মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পূর্ব কঙ্গোর মানুষের জন্য এই সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।
