ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর ফোনে আড়ি পাতার অভিযোগ ঘিরে দেশটির রাজনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অভিযোগের তদন্তে নেমে পুলিশের সাবেক প্রধানসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে শুধু প্রেসিডেন্টের যোগাযোগে অবৈধ নজরদারি নয়, রাজনীতিক, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের ফোনেও আড়ি পাতার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন প্রেসিডেন্ট প্রাবোও ও তাঁর পূর্বসূরি জোকো উইদোদোর রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
পুলিশের তদন্তে এখন পর্যন্ত চারজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম সাবেক জাতীয় পুলিশপ্রধান জেনারেল লিস্তিও সিগিত প্রাবোও। সম্প্রতি তাঁকে প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ নজরদারির অভিযোগ ওঠায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
কীভাবে সামনে এল নজরদারির অভিযোগ
ইন্দোনেশিয়ার পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন ফোন নম্বর নজরদারির ব্যবস্থায় যুক্ত করেছিলেন। এসব নম্বরের মধ্যে প্রেসিডেন্ট প্রাবোওর ফোন নম্বরও ছিল বলে অভিযোগ তদন্তকারীদের।
পুলিশের দাবি, আইনসম্মতভাবে যোগাযোগে আড়ি পাতার জন্য যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা, সন্দেহভাজন কর্মকর্তারা তা মানেননি। নজরদারির ব্যবস্থায় কয়েকটি নম্বর যুক্ত করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যাচাই করা হয়নি। পরে নজরদারির মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের কিছু নথি মুছে ফেলার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তকারীরা এ ঘটনায় একাধিক মোবাইল ফোন, একটি ট্যাবলেট কম্পিউটার ও কয়েকটি তথ্য সংরক্ষণকারী যন্ত্র জব্দ করেছেন। কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের বক্তব্যও নেওয়া হয়েছে। তবে কার নির্দেশে নজরদারি চালানো হয়েছিল, সংগৃহীত তথ্য কারা ব্যবহার করেছে এবং এর পেছনে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে আটক
প্রথম পর্যায়ে তিনজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে লিস্তিও সিগিত ছাড়াও ছিলেন পুলিশের আইনবিষয়ক বিভাগের একজন কর্মকর্তা এবং পুলিশ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। পরে তদন্তকারীরা আরও একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর বিরুদ্ধে নজরদারি কার্যক্রমের অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁকে তখনো আটক করা হয়নি বলে জানানো হয়।
সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে ইলেকট্রনিক যোগাযোগে অবৈধ হস্তক্ষেপ, অনুমতি ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় প্রবেশ এবং ডিজিটাল তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগ আনা হতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার নতুন দণ্ডবিধি ও ইলেকট্রনিক তথ্যসংক্রান্ত আইনে এসব অপরাধের জন্য কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত অভিযোগগুলো তদন্তাধীন। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হয়নি। তাঁদের পক্ষ থেকেও সব অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি।
রাজনীতির অন্দরমহলে বাড়ছে সন্দেহ
এই ঘটনা শুধু পুলিশের অভ্যন্তরীণ অনিয়মের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই। ইন্দোনেশিয়ার রাজনীতিতে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর সম্পর্কের টানাপোড়েনের সঙ্গেও বিষয়টি যুক্ত হয়ে পড়েছে।
প্রাবোও একসময় উইদোদোর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। ২০১৪ ও ২০১৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁরা মুখোমুখি হয়েছিলেন। পরে উইদোদোর সরকারে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পান প্রাবোও। ২০২৪ সালের নির্বাচনে উইদোদোর সমর্থন পেয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এমনকি উইদোদোর ছেলে গিবরান রাকাবুমিং রাকাও তাঁর রানিংমেট হিসেবে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দুই নেতার সম্পর্ক আগের মতো আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। মন্ত্রিসভায় রদবদল, গুরুত্বপূর্ণ পদে উইদোদোর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রভাব কমে যাওয়া এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, নজরদারির অভিযোগ এই রাজনৈতিক দূরত্ব আরও বাড়াতে পারে। তবে তদন্তে প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট বা তাঁর ঘনিষ্ঠ কোনো পক্ষের সঙ্গে এই ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
রাজধানীতে সেনা মোতায়েন, উদ্বেগের নতুন মাত্রা
অভিযোগ সামনে আসার পর জাকার্তায় বিপুলসংখ্যক সেনাসদস্য মোতায়েনের খবরও আলোচনায় এসেছে। সামরিক বাহিনী বলেছে, এটি নিয়মিত নিরাপত্তা প্রস্তুতির অংশ; নজরদারি কেলেঙ্কারির সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। তবে একই সময়ে রাজধানীতে সেনা মোতায়েন এবং পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের আটক হওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে ঘটনাটিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য, আইনগত ভিত্তি ছাড়া নাগরিকদের ফোনে আড়ি পাতা হলে তা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন।
তদন্তের ফলের দিকে তাকিয়ে ইন্দোনেশিয়া
এই কেলেঙ্কারির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা। প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে সাংবাদিক ও সাধারণ নাগরিক—কারও যোগাযোগই যদি বেআইনিভাবে পর্যবেক্ষণের ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তদন্তে নজরদারির উদ্দেশ্য, নির্দেশদাতা এবং তথ্যের সম্ভাব্য ব্যবহার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া জরুরি। একই সঙ্গে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, ঘটনাটি শুধু কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার সক্ষমতারও পরীক্ষা।
