বিমানের জানালা গোল বা ডিম্বাকৃতির হওয়ার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো নিরাপত্তা। তবে এই নকশার গুরুত্ব প্রকটভাবে সামনে আসে ১৯৫০-এর দশকে, যখন ব্রিটিশ যাত্রীবাহী জেট বিমান ডি হ্যাভিল্যান্ড কমেট একাধিক ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়।
১৯৫২ সালে বাণিজ্যিক যাত্রী পরিবহন শুরু করা কমেট ছিল বিশ্বের প্রথম দিককার জেট যাত্রীবাহী বিমান। এর জানালাগুলো ছিল প্রায় বর্গাকার। ১৯৫৪ সালে দুটি কমেট বিমান আকাশে ভেঙে পড়ে। তদন্তে দেখা যায়, বিমানের কেবিনে বারবার চাপের পরিবর্তনের কারণে ধাতব কাঠামোয় ক্লান্তিজনিত ফাটল তৈরি হয়েছিল। জানালার কোণসহ কিছু নির্দিষ্ট স্থানে চাপের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় ফাটল ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
এই দুর্ঘটনাগুলো বিমান নির্মাণের নকশা ও নিরাপত্তা পরীক্ষায় বড় পরিবর্তন আনে। প্রকৌশলীরা বুঝতে পারেন, শুধু ধাতুর শক্তি বাড়ালেই হবে না; কাঠামোর প্রতিটি অংশের আকৃতিও এমন হতে হবে, যাতে চাপের ভার যথাসম্ভব মসৃণভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
জানালার কোণ কীভাবে বিপদ তৈরি করতে পারে?
একটি বিমানের দেহকে অনেকটা বড়, চাপসহনশীল নলের সঙ্গে তুলনা করা যায়। উড়োজাহাজ যখন অনেক উঁচুতে ওঠে, তখন বাইরের বায়ুচাপ কমে যায়। যাত্রীদের শ্বাস নেওয়ার উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখতে কেবিনের ভেতরের চাপ বাইরের তুলনায় বেশি রাখা হয়।
এই চাপ বিমানের গায়ে বাইরের দিকে বল প্রয়োগ করে। জানালার জন্য বিমানের দেহে ছিদ্র তৈরি করতে হয় বলে ওই অংশে চাপ বহনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হয়। তখন জানালার চারপাশের কাঠামোকে অতিরিক্ত ভার বহন করতে হয়।
বর্গাকার জানালার তীক্ষ্ণ কোণে এই চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি কেন্দ্রীভূত হতে পারে। বারবার চাপের পরিবর্তন ঘটলে ওই জায়গায় ক্ষুদ্র ফাটল তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। গোল বা ডিম্বাকৃতির জানালায় তীক্ষ্ণ কোণ না থাকায় চাপ চারপাশে তুলনামূলক মসৃণভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিপজ্জনক চাপের ঘনত্ব কমানো সম্ভব হয়।
শুধু গোল জানালাই কি বিমানকে নিরাপদ রাখে?
না। জানালার আকৃতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি বিমানের নিরাপত্তার একটি অংশমাত্র। জানালার চারপাশে শক্তিশালী কাঠামো, উপযুক্ত উপাদান, নির্ভরযোগ্য সিল এবং চাপ সহ্য করতে সক্ষম স্বচ্ছ প্যানেল ব্যবহার করা হয়।
যাত্রীবাহী বিমানের জানালায় সাধারণত একাধিক স্বচ্ছ স্তর থাকে। নকশাভেদে এসব স্তরের কাজ আলাদা হতে পারে। কিছু স্তর কেবিনের চাপ বহনে সহায়তা করে, অন্য স্তর অতিরিক্ত সুরক্ষা দেয়। যাত্রীরা যে ভেতরের স্বচ্ছ পাতটি দেখতে পান, সেটিই সব সময় কেবিনের চাপ ধরে রাখার প্রধান স্তর নয়।
বিমানের জানালা ও তার সংযোগস্থলকে তাপমাত্রার পরিবর্তন, কম্পন, কাঠামোর সামান্য বাঁক এবং বারবার চাপের চক্র সহ্য করার উপযোগী করে তৈরি করতে হয়। নিয়মিত পরিদর্শন ও নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য।
তাহলে জানালা পুরোপুরি গোল নয় কেন?
বিমানের জানালা দেখতে গোল মনে হলেও অধিকাংশ যাত্রীবাহী বিমানে এগুলো আসলে ডিম্বাকৃতির অথবা গোল কোণযুক্ত আয়তাকার। এর পেছনে রয়েছে নিরাপত্তা ও ব্যবহারিক সুবিধার সমন্বয়।
একটি ডিম্বাকৃতির জানালা যাত্রীকে ওপর-নিচে তুলনামূলক ভালো দৃশ্য দেখাতে পারে। একই সঙ্গে বিমানের ভেতরের আসন, দেয়াল, জানালার মধ্যবর্তী কাঠামো এবং অন্যান্য অংশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এটি তৈরি করা যায়।
অন্যদিকে, নিখুঁত বৃত্তাকার জানালা ব্যবহার করাও প্রকৌশলগতভাবে সম্ভব। কিন্তু জানালার আকার নির্ধারণের সময় দৃশ্যমানতা, কাঠামোগত শক্তি, ওজন, যাত্রীদের আরাম এবং উৎপাদনব্যবস্থার মতো বিষয় বিবেচনা করতে হয়। তাই সব বিমানে একই আকৃতির জানালা দেখা যায় না।
একটি ছোট নকশা, যার পেছনে রয়েছে বড় শিক্ষা
বিমানের জানালার আকৃতি দেখলে বিষয়টি সাধারণ নকশার সিদ্ধান্ত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে পদার্থবিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং অতীতের দুর্ঘটনা থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা।
আধুনিক বিমান নির্মাতারা জানালার আকার ও কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করেন, যাতে দীর্ঘদিনের ব্যবহারেও চাপজনিত ক্ষতির ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে থাকে। নতুন উপাদান ও প্রযুক্তি এলেও চাপের ভার সঠিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বদলায়নি।
তাই বিমানের জানালা গোল বা ডিম্বাকৃতির হওয়ার কারণ শুধু সুন্দর দেখানো কিংবা যাত্রীদের বাইরের দৃশ্য দেখানো নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিমানের দেহের শক্তি বজায় রাখা এবং হাজার হাজার উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় কাঠামোর ওপর পড়া চাপ নিরাপদভাবে সামলানো।
