চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টিতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের ব্যাপ্তি এবার নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছে। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে ৩৩ সদস্যকে বহিষ্কারের তথ্য সামনে এসেছে। একই সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত সদস্যের সংখ্যা নেমে এসেছে নজিরবিহীন পর্যায়ে। সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রাদেশিক নেতৃত্ব—বিভিন্ন স্তরে ধারাবাহিক তদন্ত ও অপসারণের ঘটনা চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে তাঁর শাসনের অন্যতম প্রধান কর্মসূচি হিসেবে তুলে ধরেছেন। প্রথম দিকে সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্তের পরিধি বাড়লেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিযান পৌঁছেছে দলের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা এবং সামরিক বাহিনীর উচ্চপর্যায়ে। এবারের ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, এই অভিযান এখনো থামার কোনো লক্ষণ নেই।
এক বৈঠকেই ৩৩ সদস্য বহিষ্কার
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পঞ্চম প্লেনাম বা কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষ হয় ২৯ অক্টোবর। চার দিন ধরে চলা বৈঠকে দলের শৃঙ্খলা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং নেতৃত্বের জবাবদিহি বিশেষ গুরুত্ব পায়। বৈঠক শেষে প্রকাশিত ঘোষণায় ৩৩ জন সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
বহিষ্কৃতদের মধ্যে ১৬ জন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাঁদের বিরুদ্ধে ‘গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গ ও আইন লঙ্ঘনের’ অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ বা তদন্তের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
বৈঠকে উপস্থিতির সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম। কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্ণ ও বিকল্প সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ২৭৯ জন। ২০২৫ সালের আগের প্লেনামে উপস্থিতির সংখ্যা ছিল ৩১৫, আর ২০২৪ সালে ছিল ৩৬৪। ২০২২ সালে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের সময় সদস্যসংখ্যা ছিল ৩৭০-এর বেশি। ফলে এবারের বৈঠকে এত বেশি আসন খালি থাকা চীনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
সামরিক নেতৃত্বেও বড় ধরনের পরিবর্তন
শুদ্ধি অভিযানের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে ধারাবাহিক অপসারণ। বহিষ্কৃতদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ঝাং ইউশিয়া এবং সাবেক জিনজিয়াং পার্টি প্রধান মা শিংরুই। ঝাং ইউশিয়া একসময় চীনের কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। এই কমিশনই দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা।
চীনের সামরিক নেতৃত্বে এত উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামরিক আধুনিকায়ন, নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ এবং তাইওয়ান ঘিরে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এমন সময়ে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অপসারণ সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের সদস্যসংখ্যাও কমে এসেছে। একসময় সাত সদস্যের এই সংস্থায় এখন কার্যত সি চিন পিংয়ের পাশাপাশি ভাইস চেয়ারম্যান ঝাং শেংমিন রয়েছেন। এত বড় পরিবর্তন সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, নাকি ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করার কৌশল
চীনা সরকারের ভাষ্য, দুর্নীতি কমানো এবং দলের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই এই অভিযান। দলীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। সরকারের মতে, দুর্নীতি কমানো না গেলে প্রশাসনের কার্যকারিতা ও জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তবে পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করেন, অভিযানের রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। তাঁদের মতে, দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি দলীয় আনুগত্য, নেতৃত্বের নির্দেশ মানা এবং রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে অভিযানটি শুধু আর্থিক অনিয়মের তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ক্ষমতার কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করতে পারে।
চীনের সরকারি সংস্থাগুলো অবশ্য এসব ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে। তাদের বক্তব্য, কোনো কর্মকর্তা যত উচ্চপদেই থাকুন না কেন, শৃঙ্খলাভঙ্গ করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শুধু শীর্ষ নেতা নন, প্রশাসনের বিস্তৃত অংশেও তদন্ত
চীনের দুর্নীতিবিরোধী নজরদারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে দল ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর আগে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বিলাসিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে লাখ লাখ কর্মকর্তাকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, অভিযানটি কেবল কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় প্রশাসন, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং দলীয় কাঠামোর বিভিন্ন স্তরেও এর প্রভাব পড়ছে।
তবে এত বড় পরিসরে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও দুর্নীতি কতটা কমেছে, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন। চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তদন্তের তথ্য ও বিচারপ্রক্রিয়ার অনেক অংশই জনসমক্ষে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয় না।
চীনের রাজনীতি ও সামরিক প্রস্তুতির সামনে প্রশ্ন
সি চিন পিংয়ের শাসনামলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ক্ষমতাসীন দলের শৃঙ্খলা জোরদারে ভূমিকা রেখেছে—এমন দাবি করে বেইজিং। কিন্তু একই সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ে ঘন ঘন অপসারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রেও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন।
২০২৭ সালে চীনের ২১তম পার্টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেই সম্মেলনের আগে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস ও দলীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে বর্তমান শুদ্ধি অভিযান শুধু দুর্নীতি দমনের কর্মসূচি নয়, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের কাঠামো গঠনের সঙ্গেও সম্পর্কিত হয়ে উঠতে পারে।
চীনের ক্ষমতাসীন দলের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে দুর্নীতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, অন্যদিকে প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর কার্যকারিতা বজায় রাখা। রেকর্ডসংখ্যক বহিষ্কার সেই চ্যালেঞ্জের গভীরতাই তুলে ধরছে।
