দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলের শাসনামলে বিরোধী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা সাজানো হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিশেষ তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির পার্লামেন্ট। এ বিষয়ে একটি বিল পাস হয়েছে, যার আওতায় ১২টি ঘটনা তদন্তের সুযোগ তৈরি হবে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে সাবেক সরকারের সময় প্রসিকিউশন সার্ভিস, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বোর্ডের ক্ষমতার অপব্যবহার।
শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় পরিষদে বিলটি ১৬৭-১ ভোটে পাস হয়। বিরোধী পিপল পাওয়ার পার্টি ভোট বর্জন করে। দলটির আইনপ্রণেতারা বিলটির বিরুদ্ধে ২৪ ঘণ্টার ফিলিবাস্টার বা দীর্ঘ বক্তব্যের মাধ্যমে ভোট ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির উদ্যোগে বিলটি পাস হয়।
কেন নতুন তদন্তের উদ্যোগ
ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির অভিযোগ, ইউন সুক ইওলের প্রশাসনের সময় রাষ্ট্রীয় তদন্ত ও প্রসিকিউশন ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল। বিরোধী নেতা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তৈরি, সাক্ষ্য প্রভাবিত করা এবং প্রমাণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
বিল অনুযায়ী, বিশেষ কৌঁসুলি নিয়োগ করা হলে তিনি ১২টি ঘটনা তদন্ত করবেন। এর মধ্যে বর্তমান প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট মুন জে ইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলাও রয়েছে। তদন্তের লক্ষ্য হবে, এসব মামলায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নিরপেক্ষভাবে কাজ করেছিল, নাকি রাজনৈতিক নির্দেশনা বা প্রভাবের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিয়েছিল—তা যাচাই করা।
বিশেষ কৌঁসুলির দল গঠনের ক্ষেত্রে বড় পরিসরের জনবল ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে সর্বোচ্চ ৩০৯ জন থাকতে পারেন। তাঁদের মধ্যে ২০ জন প্রসিকিউটর এবং ২১০ জন সরকারি কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। প্রস্তুতির সময়সহ তদন্তের জন্য সর্বোচ্চ ২০০ দিন সময় রাখা হয়েছে।
সংসদে তীব্র বিরোধিতা
বিলটি পাসের আগে জাতীয় পরিষদে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দেয়। পিপল পাওয়ার পার্টির আইনপ্রণেতারা মনে করেন, নতুন তদন্তের উদ্যোগ রাজনৈতিক প্রতিশোধের অংশ হতে পারে। তাঁদের অভিযোগ, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল সাবেক সরকারের আমলের তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে।
অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক পার্টির বক্তব্য, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন মামলা করা হয়ে থাকে, তাহলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কোনো সরকার বা রাজনৈতিক দলের প্রভাবের বাইরে থেকে তদন্ত পরিচালনার জন্যই বিশেষ কৌঁসুলি নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বিলটি পাসের সময় বিরোধী দলের সদস্যরা ভোটে অংশ নেননি। ফলে উপস্থিত ১৬৮ জন আইনপ্রণেতার মধ্যে ১৬৭ জন পক্ষে এবং একজন বিপক্ষে ভোট দেন।
ইউন সুক ইওলের শাসনামলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ইউন সুক ইওল ২০২২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি দেশটির প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর প্রশাসনের সময় বিরোধী দল ও সরকারের মধ্যে একাধিক বিষয়ে সংঘাত তৈরি হয়। বিশেষ করে তদন্ত, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক বাড়তে থাকে।
ইউনের রাজনৈতিক জীবন শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সাংবিধানিক সংকটের মুখে পড়ে। তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও সামরিক আইন জারির সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই প্রেক্ষাপটে সাবেক প্রশাসনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নতুন করে পর্যালোচনার দাবি ওঠে।
বর্তমান তদন্তের উদ্যোগ সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক ও আইনি হিসাব-নিকাশেরই অংশ। তবে ১২টি মামলার প্রতিটি বিষয়ে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছিল, তা তদন্তের আগে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
তদন্তের পরিধি ও সময়সীমা
বিল অনুযায়ী, বিশেষ কৌঁসুলির জন্য তিনটি রাজনৈতিক দল—ডেমোক্রেটিক পার্টি, পিপল পাওয়ার পার্টি এবং রিবিল্ডিং কোরিয়া পার্টি—একজন করে প্রার্থীর নাম সুপারিশ করবে। তাঁদের মধ্য থেকে প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং একজনকে নিয়োগ দেবেন।
তবে বিলটি পাস হওয়াই তদন্ত শুরুর শেষ ধাপ নয়। আইনটি কার্যকর হওয়া এবং বিশেষ কৌঁসুলি নিয়োগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর তদন্ত শুরু হতে পারবে। এরপর সংশ্লিষ্ট নথি, সাক্ষ্য, তদন্তকারী সংস্থার সিদ্ধান্ত এবং প্রসিকিউশন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা হবে।
তদন্তে যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা সাজানো হয়েছিল বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের পথ তৈরি হতে পারে। আবার অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না মিললে সেসব দাবির ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক
এই তদন্ত দেশটির বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। একদিকে সাবেক প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে, অন্যদিকে তদন্ত যেন নতুন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদলের পর আগের সরকারের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত নতুন নয়। তবে ১২টি মামলাকে একসঙ্গে বিশেষ কৌঁসুলির আওতায় আনার উদ্যোগের পর রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে প্রমাণের মান, আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং তদন্তকারীদের স্বাধীনতার ওপর।
