যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ, পররাষ্ট্রনীতির বিতর্ক এবং প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মকাণ্ডের কারণে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন কর্মকর্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দায়িত্বে থাকার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা। নির্বাচনী বিপর্যয়ের পরও আপাতত তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানো রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের ফলাফলে অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
হেগসেথের দায়িত্ব নিয়ে ট্রাম্পের সমর্থন
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনে তাঁর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের পর তাঁর ওপর দায় চাপানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে।
তবে ৪ নভেম্বর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় হেগসেথের কাজের প্রশংসা করেন ট্রাম্প। তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরানোর কথা ভাবছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট বলেন, হেগসেথ খুব ভালো কাজ করছেন। পরদিনও নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে ট্রাম্প জানান, প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে দায়িত্বে রাখার ব্যাপারে তাঁর পূর্ণ আগ্রহ রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের ভেতরে অবশ্য পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। কয়েকজন কর্মকর্তা ও রিপাবলিকান নেতার মধ্যে হেগসেথের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ
রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে ইরান যুদ্ধকে সামনে আনা হচ্ছে। প্রায় আট মাস ধরে চলা সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও নির্বাচনের পর প্রকাশ্যে ইরান যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, সংঘাতটি রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ক্ষতির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, হেগসেথের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সামরিক সংঘাত শুরু করার অভিযোগও রয়েছে। রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা থমাস ম্যাসি তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব পুনরায় উত্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ডেমোক্র্যাটরাও আগামী জানুয়ারিতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর পেন্টাগনের কর্মকাণ্ড তদন্তের ঘোষণা দিয়েছেন।
রুবিওর দায়িত্ব ছাড়ার গুঞ্জন
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে নিয়েও সম্প্রতি নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। তিনি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী হওয়ার সম্ভাব্য মুখগুলোর একজন। ফলে নির্বাচনের পর প্রশাসনে তাঁর অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে রুবিও জানিয়েছেন, ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রশাসনে কাজ করার পরিকল্পনাই রয়েছে। দায়িত্ব ছাড়ার বিষয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন খবর নিয়েও তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করছেন রুবিও। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতিতে তাঁর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। ইরান, ইসরায়েল, ইউক্রেন এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে তাঁর ভূমিকা রয়েছে।
নতুন কংগ্রেসে কঠিন পরীক্ষার মুখে প্রশাসন
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ের ফলে আগামী জানুয়ারি থেকে ট্রাম্প প্রশাসনকে অনেক বেশি রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপের মুখে পড়তে হবে। কংগ্রেসের তদন্ত, বাজেট অনুমোদন এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের বিষয়ে নতুন বাধার মুখে পড়তে পারেন প্রেসিডেন্ট।
বিশেষ করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড, ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্ত এবং সামরিক নেতৃত্বে পরিবর্তন নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা তদন্ত করতে চান। হেগসেথের জন্য বিষয়টি আরও জটিল হতে পারে। কারণ, তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনার একটি অংশ রিপাবলিকান দলের ভেতর থেকেও আসছে।
তবে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের হাতে এখনো যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সামরিক অভিযান এবং কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে অক্ষুণ্ন থাকবে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে দলের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সামাল দেওয়া, অন্যদিকে নতুন ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করা। রুবিও ও হেগসেথকে দায়িত্বে রাখার বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান আপাতত স্থিতিশীলতার বার্তা দিলেও আগামী দিনগুলোতে তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নির্ভর করবে প্রশাসনের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর।
