হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের পরিচিত মুখ জশুয়া ওংকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। চীনের আরোপ করা জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে বৃহস্পতিবার এ সাজা ঘোষণা করা হয়। একসময় হংকংয়ের রাজপথে গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে নেতৃত্ব দেওয়া এই তরুণের দীর্ঘ কারাদণ্ড শহরটির রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং বিরোধী মত প্রকাশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
৩০ বছর বয়সী ওং ২০১৯ সালের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিতি পান। শিক্ষার্থী আন্দোলন থেকে শুরু করে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিবাদ—বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। একসময় তাঁকে হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু ২০২০ সালে চীন জাতীয় নিরাপত্তা আইন কার্যকর করার পর তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আইনি ঝুঁকির মুখে পড়ে।
কী অভিযোগে ১০ বছরের কারাদণ্ড
আদালতের অভিযোগ, ২০২০ সালে ওং নির্বাসিত হংকংয়ের আরেক গণতন্ত্রপন্থী কর্মী নাথান ল এবং অন্যদের সঙ্গে মিলে বিদেশি সরকার ও প্রতিষ্ঠানের কাছে চীন এবং হংকংয়ের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ ও অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। মামলায় ওংয়ের রাজনৈতিক সংগঠন ডেমোসিস্টোর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, বিদেশি রাজনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক এবং হংকংয়ের পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশে প্রচার চালানোর বিষয়গুলোও সামনে আনা হয়।
ওং গত সেপ্টেম্বর আদালতে অভিযোগ স্বীকার করেন। বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের বিচারক উইলিয়াম ট্যাম তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন। বিচারকের পর্যবেক্ষণে অপরাধের গুরুত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে সমাজের কঠোর অবস্থান তুলে ধরা হয়। তবে দণ্ড নির্ধারণে ওংয়ের দোষ স্বীকার, অনুশোচনা এবং কারাগারে তাঁর শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
আন্দোলনের রাজপথ থেকে কারাগার
জশুয়া ওংয়ের রাজনৈতিক পরিচিতি তৈরি হয় কিশোর বয়সেই। ২০১২ সালে হংকংয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রস্তাবিত পরিবর্তনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরে ২০১৪ সালের ‘আমব্রেলা মুভমেন্ট’ বা ছাতা আন্দোলনের সময় তিনি আরও পরিচিত হয়ে ওঠেন। ওই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল হংকংয়ের নেতৃত্ব নির্বাচনে অধিকতর গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা।
২০১৯ সালে অপরাধী প্রত্যর্পণসংক্রান্ত একটি বিলের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হলে তিনি আবারও আন্দোলনের সামনের সারিতে আসেন। ওই বিক্ষোভ পরে হংকংয়ের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক সংস্কার, পুলিশের ভূমিকা এবং নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নে বড় আন্দোলনে রূপ নেয়।
তবে আন্দোলনের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ২০২০ সালের জুনে চীন হংকংয়ের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা আইন কার্যকর করে। আইনটির আওতায় বিচ্ছিন্নতাবাদ, রাষ্ট্রক্ষমতা উৎখাতের চেষ্টা, সন্ত্রাসবাদ এবং বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশের মতো অপরাধের বিধান রাখা হয়। চীনের সরকার বলেছে, আইনটি হংকংয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এর ফলে বিরোধী রাজনীতি, সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগও হলো মামলার অংশ
ওংয়ের বিরুদ্ধে মামলায় বিদেশি রাজনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক সংগঠন ডেমোসিস্টোর সদস্যরা হংকংয়ের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ও বর্তমান প্রভাবশালী রাজনীতিকদের সঙ্গেও তাঁদের বৈঠক হয়েছিল।
আদালতে এসব যোগাযোগকে বিদেশি শক্তির কাছে চাপ প্রয়োগের আহ্বানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে মানবাধিকারকর্মীদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক মহলের কাছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরা এবং নিষেধাজ্ঞা চাওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে আইনি ও রাজনৈতিক পার্থক্য রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, জাতীয় নিরাপত্তা আইনের বিস্তৃত ব্যাখ্যা ভবিষ্যতে আরও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
হংকংয়ের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে প্রভাব
ওংয়ের কারাদণ্ড এমন এক সময়ে এল, যখন হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের অনেক পরিচিত নেতা কারাগারে, নির্বাসনে অথবা সক্রিয় রাজনীতির বাইরে রয়েছেন। গণতন্ত্রপন্থী দলগুলোর কার্যক্রমও আগের তুলনায় অনেক সীমিত। এর আগে সংবাদমাধ্যমের উদ্যোক্তা জিমি লাইকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ফলে ওংয়ের সাজাকে হংকংয়ের বিরোধী রাজনীতির ওপর চাপের ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
চীন ও হংকং কর্তৃপক্ষের অবস্থান অবশ্য ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং শহরের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য আইনটি প্রয়োজনীয়। অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন, নিরাপত্তার নামে রাজনৈতিক বিরোধিতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিসর কতটা সীমিত করা হচ্ছে।
জশুয়া ওংয়ের ১০ বছরের কারাদণ্ড তাই শুধু একজন আন্দোলনকারীর ব্যক্তিগত পরিণতি নয়। এটি হংকংয়ের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গত কয়েক বছরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। যে শহর একসময় গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ছিল, সেখানে এখন রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সীমা কোথায়—সেই প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।
