স্পেনের দ্রুতগতির রেলব্যবস্থা একসময় দেশটির প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও আধুনিক অবকাঠামোর অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু এক বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে দুটি ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় ১১৫ জনের প্রাণহানি সেই ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সর্বশেষ দুর্ঘটনায় ৬৯ জন নিহত হওয়ার পর অবশেষে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে। তাঁর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে স্পেনের রেলব্যবস্থার নিরাপত্তা, অব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
৩ নভেম্বর দেশটির পার্লামেন্টের স্থায়ী কমিটিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় পদত্যাগের ঘোষণা দেন পুয়েন্তে। তিনি বলেন, এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এত বড় দুটি দুর্ঘটনার পর একজন পরিবহনমন্ত্রীর পক্ষে দায়িত্বে থাকা সম্ভব নয়। দুর্ঘটনা দুটির প্রকৃতি ভিন্ন হলেও এত মানুষের প্রাণহানির দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন তিনি।
দুটি দুর্ঘটনায় কেঁপে উঠেছে স্পেনের রেলব্যবস্থা
চলতি বছরের জানুয়ারিতে স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় আদামুজ এলাকায় প্রথম বড় দুর্ঘটনাটি ঘটে। দ্রুতগতির একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে ৪৬ জন নিহত হন। আহত হন আরও অনেকে।
এরপর ২৮ অক্টোবর মধ্য স্পেনের উর্দা এলাকায় ঘটে দ্বিতীয় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। একটি স্থির অবস্থায় থাকা বেসরকারি পরিচালনাধীন ইরিও ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা রেনফের একটি দ্রুতগতির ট্রেনের। এতে ৬৯ জন নিহত এবং প্রায় ২০০ জন আহত হন।
দুটি দুর্ঘটনাই স্পেনের গুরুত্বপূর্ণ মাদ্রিদ-সেভিল রেলপথে ঘটেছে। ফলে দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্রুতগতির রেল যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ১১৫ জনের মৃত্যু শুধু দুটি পৃথক দুর্ঘটনার হিসাব নয়; এটি একটি জাতীয় অবকাঠামোর ওপর মানুষের আস্থার বড় ধরনের সংকট।
কীভাবে ঘটল সর্বশেষ দুর্ঘটনা?
সর্বশেষ দুর্ঘটনার পেছনে নিরাপত্তা ও যোগাযোগব্যবস্থার ব্যর্থতার বিষয়টি সামনে এসেছে। তদন্তে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, রেলপথের একটি অংশে সংকেতব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দেওয়ার পর স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থা কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এ কারণে ওই এলাকার ট্রেন চলাচল থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ দায়িত্ব নেয়। কিন্তু এরপর রেনফের দ্রুতগতির ট্রেনটিকে চলার অনুমতি দেওয়া হয়। অথচ একই লাইনে সামনে একটি ইরিও ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল। ফলে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়া ট্রেনটির সঙ্গে স্থির ট্রেনের সংঘর্ষ ঘটে।
পরিবহনমন্ত্রী পুয়েন্তে জানিয়েছেন, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে তদন্ত প্রয়োজন। দুর্ঘটনার সময় ট্রেনটি ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলছিল বলে বিভিন্ন প্রাথমিক তথ্যে উঠে এসেছে।
তবে দুর্ঘটনার জন্য শুধু একজন কর্মীকে দায়ী করার বিষয়ে আপত্তি তুলেছেন রেলকর্মীদের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যা, কর্মীদের ওপর চাপ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা বিবেচনায় না নিয়ে মানবিক ভুলকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না।
মন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা
পদত্যাগের আগে পুয়েন্তে রেল চলাচল নিরাপদ করতে বেশ কিছু পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে সংকেতব্যবস্থা উন্নত করা, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো এবং ইউরোপীয় রেল চলাচল ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি দ্রুত চালু করা।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ট্রেনচালক ও নিয়ন্ত্রণকক্ষের কথোপকথন পর্যবেক্ষণ এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতি শনাক্ত করা হবে। কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা অকার্যকর হলে একক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে দ্বিতীয় একজন কর্মকর্তার অনুমোদন নেওয়ার ব্যবস্থাও করা হতে পারে।
সরকার মাদ্রিদ-সেভিল রেলপথে চলাচল সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিরাপত্তা পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু এলাকায় ট্রেনের গতি কমিয়ে রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাজনৈতিক চাপের মুখে পদত্যাগ
দুর্ঘটনার পর থেকেই বিরোধী দলগুলো পরিবহনমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছিল। তাদের বক্তব্য, রেলব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। একের পর এক দুর্ঘটনার পর শুধু ব্যাখ্যা দেওয়া যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক দায়ও নিতে হবে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ পুয়েন্তের পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে এই সিদ্ধান্তে সরকারের ওপর চাপ কমবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, দুর্ঘটনার তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ নিয়ে আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
পুয়েন্তে আসন্ন নির্বাচনে নিজের দলের প্রার্থী হিসেবেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না বলে জানিয়েছেন। ফলে তাঁর পদত্যাগ কেবল মন্ত্রিত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্তেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলছে।
রেলব্যবস্থায় আস্থা ফেরানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
স্পেনের দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ। দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থা দেশটির যোগাযোগ, পর্যটন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু একই রেলপথে পরপর দুটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা মানুষের আস্থায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৌঁসুলি দপ্তরও রেলপথের নিরাপত্তা উন্নয়নে বরাদ্দ অর্থ ব্যবহারে সম্ভাব্য অনিয়মের বিষয়টি তদন্ত করছে। ফলে দুর্ঘটনার পেছনে প্রযুক্তিগত ত্রুটি ছাড়াও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও বিনিয়োগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পরিবহনমন্ত্রীর পদত্যাগ হয়তো রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার একটি বার্তা দেবে। কিন্তু নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকানো। স্পেনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—দ্রুতগতির রেলব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মানুষের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা।
