মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে রাশিয়া ও ইরানের সামরিক সহযোগিতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ইউরোপে। ফাঁস হওয়া রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পের নথিতে দেখা গেছে, ইরানের কাছে হেলিকপ্টার থেকে নিক্ষেপযোগ্য উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রের ৯০টি উৎক্ষেপক সরবরাহের চুক্তি করেছিল মস্কো। ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনী যে ধরনের নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, সেগুলো নিক্ষেপের উপযোগী এসব উৎক্ষেপক। চুক্তির তথ্য সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে রাশিয়া কতটা এগিয়েছে এবং এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপের নিরাপত্তায় কীভাবে পড়তে পারে।
প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎক্ষেপক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভিম্পেল ২০২৪ সালের মে মাসে একটি উৎপাদন পরিকল্পনা তৈরি করেছিল। সেখানে ‘কে-১০’ নামে চিহ্নিত বিদেশি ক্রেতার জন্য ৯০টি উৎক্ষেপক তৈরির কথা উল্লেখ রয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা রপ্তানিসংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ নথিতে এই সংকেত ইরানকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে চুক্তি ও উৎপাদন পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেলেও সব উৎক্ষেপক শেষ পর্যন্ত ইরানের হাতে পৌঁছেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নথিতে সরবরাহের পরিকল্পনা ও সময়সীমা থাকলেও বাস্তব সরবরাহের পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ নেই।
কী ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক পেতে পারে ইরান?
নথিতে উল্লেখিত উৎক্ষেপকগুলো রাশিয়ার এলএমইউআর বা ইজদেলিয়ে-৩০৫ নামের উন্নত নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের জন্য তৈরি। এগুলো মূলত এমআই-২৮ ধরনের আক্রমণকারী হেলিকপ্টারে ব্যবহার করা যায়। প্রতিটি উৎক্ষেপকে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র বহনের সক্ষমতা রয়েছে।
এলএমইউআর ক্ষেপণাস্ত্রের বিশেষত্ব হলো, এটি চলমান লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধেও নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে পারে। ক্ষেপণাস্ত্রটি নিক্ষেপের পরও এর গতিপথ ও লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে সাঁজোয়া যান, সামরিক অবস্থান কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত।
রুশ বাহিনী ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার অভিযান শুরুর পর থেকে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। ফলে ইরান এই প্রযুক্তি ও উৎক্ষেপক পেলে দেশটির আকাশভিত্তিক সামরিক সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে।
ইরানের সঙ্গে মস্কোর সামরিক সম্পর্ক কেন গুরুত্বপূর্ণ?
রাশিয়া ও ইরানের সামরিক সহযোগিতা নতুন নয়। ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর তেহরান মস্কোকে শাহেদ ড্রোন সরবরাহ করেছিল। পরবর্তী সময়ে রাশিয়া নিজস্ব উৎপাদনব্যবস্থার মাধ্যমে এসব ড্রোন তৈরি শুরু করে। অন্যদিকে ইরানও রাশিয়ার কাছ থেকে সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
২০২৫ সালে দুই দেশ কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। এরপর থেকে সামরিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত যোগাযোগ আরও জোরদার হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের একাধিক বৈঠকও হয়েছে।
বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত চলার সময় রাশিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কিছু মূল্যায়নে ইরানকে রাশিয়ার গোয়েন্দা তথ্য ও স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে। এসব তথ্য মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অবস্থান সম্পর্কে তেহরানকে ধারণা দিতে পারে।
ইউরোপের উদ্বেগের কারণ কোথায়?
ইউরোপের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো, রাশিয়া ও ইরানের সামরিক সহযোগিতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, উন্নত অস্ত্রপ্রযুক্তি এবং গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান দুই দেশের সামরিক সক্ষমতাকে পরস্পরের জন্য আরও কার্যকর করে তুলতে পারে।
ইউরোপের দেশগুলো ইতিমধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে রয়েছে। ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি পূর্ব ইউরোপের প্রতিরক্ষা জোরদার করতে হচ্ছে তাদের। এর মধ্যে রাশিয়া যদি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে, তাহলে ইউরোপের কৌশলগত হিসাবও জটিল হয়ে উঠবে।
এ ছাড়া ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ভবিষ্যতে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষার মতো ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
চুক্তির তথ্য প্রকাশের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে রাশিয়ার সহায়তার মাত্রা নিয়ে প্রকাশ্যে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, মস্কো তেহরানকে খুব বেশি সহায়তা করছে না। তবে ফাঁস হওয়া নথিতে দুই দেশের সামরিক সহযোগিতার আরও একটি দিক সামনে এসেছে।
ওয়াশিংটনের জন্য বিষয়টি কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। একদিকে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার পথও খোলা রাখতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।
রাশিয়াও প্রকাশ্যে ইরানকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করতে আগ্রহী নয়। কারণ, এতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্প বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধের চাহিদা মেটাতে ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের ঘাটতি ও উৎপাদনসংক্রান্ত সমস্যার কারণে নিজেদের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহেও বিলম্বের ঝুঁকি রয়েছে। ভিম্পেলের অভ্যন্তরীণ চিঠিতেও যন্ত্রাংশ সরবরাহে বিলম্বের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
তাই ৯০টি উৎক্ষেপকের চুক্তি থাকলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব সরঞ্জাম ইরানের হাতে পৌঁছেছে কি না, তা এখনো অজানা।
সব মিলিয়ে, এই চুক্তির তথ্য রাশিয়া-ইরান সম্পর্কের গভীরতা সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, ইউক্রেন সংঘাত এবং ইউরোপের নিরাপত্তা—তিনটি ক্ষেত্রের সঙ্গে বিষয়টি জড়িয়ে যাওয়ায় মস্কো ও তেহরানের সামরিক সহযোগিতার পরবর্তী ধাপ এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে।
